দূরদর্শী পরিকল্পনায় বিশ্বকে চমকে দিল কেপ ভার্দে

প্রবাসী কৌশল, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অদম্য লড়াইয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে কেপ ভার্দে; এবার সামনে আর্জেন্টিনা।

টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত রূপকথার জন্ম দিয়েছে আফ্রিকার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মাত্র সোয়া পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে বিস্মিত করেছে। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াইয়ের পর শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর নিজেদের ভাগ্য জানতে স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। মাঠেই মোবাইল ফোনে শেষ বাঁশির অপেক্ষা করছিল পুরো দল। স্পেনের জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে ভেঙে পড়ে খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। আবেগঘন সেই দৃশ্য মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের ধারাভাষ্যকার রব ল একে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, শেষ বাঁশির অপেক্ষা আর ইতিহাস গড়ার পর খেলোয়াড় ও সমর্থকদের অশ্রুসিক্ত উদযাপন ফুটবলের সৌন্দর্যকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

প্রবাসী ফুটবলারদের ঘিরেই বদলে গেছে ভাগ্য

কেপ ভার্দের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জন্ম নেওয়া কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে দেশটির ফুটবলের মানচিত্র।

বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের দলে ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নেদারল্যান্ডসের রটারডাম অঞ্চলের বাসিন্দা। পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এসব ফুটবলার ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছেন জাতীয় দলে।

২০১৯ সালে পেশাদার যোগাযোগমাধ্যম ‘লিঙ্কডইন’-এর মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রক্ষণভাগের খেলোয়াড় রবার্তো লোপেসকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়। পরে তিনিই দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সদস্যে পরিণত হন।

লোপেসের ভাষায়, কেপ ভার্দের এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং বহু বছরের পরিকল্পনা, বিশ্বাস ও ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল।

কোচ বুবিস্তার দূরদর্শী নেতৃত্ব

২০২০ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান কোচ বুবিস্তা দলটিকে নতুন রূপ দেন। শক্তিশালী রক্ষণ, সুশৃঙ্খল মাঝমাঠ ও কার্যকর আক্রমণভাগের সমন্বয়ে তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যারা বড় দলের বিপক্ষেও সমান আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারে।

স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন। তবে শুধু তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, পুরো দলের রক্ষণভাগও ছিল অসাধারণ। স্পেনের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে মাত্র একটি ফাউল করে কেপ ভার্দে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিরল একটি পরিসংখ্যান।

ডিফেন্ডার সিডনি লোপেস কাবরাল বলেন, দল হিসেবে দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ফলই মাঠে প্রতিফলিত হচ্ছে। এটাই তাদের স্বাভাবিক খেলার ধরন।

অন্যদিকে উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ২-২ সমতায় ফেরা দলটির মানসিক দৃঢ়তারও বড় প্রমাণ।

বুবিস্তার মতে, ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দলের পরিচয়, ঐক্য, শক্তি ও সহনশীলতা ধরে রাখা। তার বিশ্বাস, ফুটবল শুধু বড় দেশগুলোর জন্য নয়; ছোট দেশগুলোরও স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অধিকার রয়েছে।

এবার সামনে আর্জেন্টিনা

ঐতিহাসিক সাফল্যের পর নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের সামনে অপেক্ষা করছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি।

তবে প্রতিপক্ষের নাম দেখে ভীত নয় কেপ ভার্দে। বুবিস্তা বলেছেন, তাদের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। বিশ্বকাপে এসে নিজেদের দেশকে বিশ্বের সামনে পরিচিত করানোই ছিল অন্যতম লক্ষ্য। আর আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলার সুযোগ কেপ ভার্দের জন্য গর্বের বিষয়।

ম্যাচসেরা মিডফিল্ডার ডেরয় ডুয়ার্তেও আত্মবিশ্বাসী। তার ভাষায়, সবকিছু এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ কঠিন হবে, কিন্তু ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

বিশ্ব ফুটবলে নতুন বার্তা

৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে নানা সমালোচনা থাকলেও কেপ ভার্দের সাফল্য সেই বিতর্কে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার গ্যারি নেভিল বলেছেন, মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ নকআউটে উঠেছে, অথচ উরুগুয়ের মতো পরাশক্তি বিদায় নিয়েছে। বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ যে নতুন গল্প, নতুন স্বপ্ন ও নতুন নায়ক তৈরি করতে পারে, কেপ ভার্দে তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

কেপ ভার্দের এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুধু একটি দলের সাফল্যের গল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রবাসী প্রতিভার কার্যকর ব্যবহার, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অদম্য আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও তারা আরেকটি বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে কি না।