তেল সংকট ঘনীভূত, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপের সময়

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে জ্বালানি ঝুঁকি তীব্র, মজুত কমে সতর্ক সংকেত
বদিউল আলম লিংকন: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এইরকম ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশ গুরুতর তেল সংকটে পড়তে পারে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত ইতোমধ্যে এক মাস অতিক্রম করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়ার অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
প্রয়োজনীয় সমন্বিত পদক্ষেপ
স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বিকল্প উৎস (রাশিয়া, ভারত, আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র) থেকে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা।
ইআরএলের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো এবং দ্বিতীয় রিফাইনারি প্রকল্প ত্বরান্বিত করা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) ব্যবহার বাড়ানো।
হোর্ডিং বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং ফিলিং স্টেশনে দৈনিক স্টক প্রদর্শন চালু রাখা।
সরকার ‘কোনো সংকট নেই’ বললেও বাস্তবে দীর্ঘ সারি ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এখনই সব অংশীজনের (সরকার, ব্যবসায়ী, জনগণ) সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট জ্বালানি তেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন। এর মধ্যে ডিজেল ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন। জ্বালানি বিভাগ বলছে, এই মজুত ১৫-১৬ দিনের চাহিদা মেটাতে পারবে এবং এপ্রিল মাসে সংকট হবে না। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে (রয়টার্স, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, আল জাজিরা) বলা হচ্ছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ‘তেল-শূন্য’ দেশ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের মজুত মাত্র ৩৭,৯৯০ টন, যা ৬ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। দৈনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ৩,৭০০-৩,৮০০ টন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দুটি চালান বাতিল হয়েছে। ফলে রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল শোধনের জন্য দেশের একমাত্র বড় স্থাপনা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সক্ষমতা মোট চাহিদার সীমিত অংশ পূরণ করে। ফলে ৮০ শতাংশেরও বেশি পরিশোধিত জ্বালানি সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বর্তমান সংকটে এই নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দেশে অপরিশোধিত তেলের মজুত সীমিত এবং ডিজেলের মজুতও দ্রুত কমে আসছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি স্টেশনে সরবরাহ সংকোচন, দীর্ঘ লাইন এবং অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা, সীমিত সরবরাহ ব্যবস্থা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়াসহ নতুন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দেশের শোধনাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জনগণের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় মজুত প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ অবস্থায় স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনআস্থা বজায় রাখা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমেই সরকারকে প্রাধান্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার বন্ধে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং কালোবাজারি ও অতিরিক্ত মজুত ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। জনআস্থা ধরে রাখতে নিয়মিতভাবে জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বল্পমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে এবং কমপক্ষে এক থেকে দুই মাসের কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নীতিগত সহায়তা ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে জ্বালানির ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে।
মধ্যমেয়াদে দেশের শোধনাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে একক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অপচয় রোধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ, দেশীয় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান এবং স্থায়ী কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে জনগণেরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং প্যানিক করে অতিরিক্ত মজুত না করা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে। সার্বিকভাবে, সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।





