থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে ৭২ বন্দি বাঘের মৃত্যু

থাইল্যান্ডের বাঘ-পর্যটন শিল্পে বড় প্রশ্ন
টুইট প্রতিবেদক: থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিয়াং মাই (Chiang Mai) এর বহুল আলোচিত পর্যটনকেন্দ্র Tiger Kingdom–এ মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ৭২টি বন্দি বাঘের মৃত্যু দেশটির বিতর্কিত ‘বাঘ-পর্যটন’ শিল্পকে নতুন করে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রাণীকল্যাণ সংগঠনগুলো এটিকে থাইল্যান্ডে বন্দি বাঘের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ গণমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির দুটি শাখা “ম্যা তেং” ও ”ম্যা রিম” মিলে মোট ২৪৬টি বাঘ ছিল। এর মধ্যে ম্যা তেং শাখায় ৫১টি এবং ম্যা রিম শাখায় ২১টি বাঘ মারা গেছে। প্রাথমিক তদন্তে ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস ও মাইকোপ্লাজমা ব্যাকটেরিয়ার যৌথ সংক্রমণকে দায়ী করা হয়েছে, যা নিউমোনিয়ায় রূপ নিয়ে দ্রুত প্রাণঘাতী হয়েছে। পরীক্ষাগারে বার্ড ফ্লু বা অন্য কোনো উচ্চঝুঁকির ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে একাধিক জ্যেষ্ঠ ভেটেরিনারিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন দুটি আলাদা স্থানে, প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে, একই সময়ে অভিন্ন উপসর্গ কীভাবে দেখা দিল? তাঁদের আশঙ্কা, একই সরবরাহকারীর কাঁচা মুরগির মাংস দূষিত থাকলে তা সংক্রমণের প্রধান উৎস হতে পারে। বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।
থাইল্যান্ডের লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক সোমচুয়ান রাতানমুংক্লানন সাংবাদিকদের বলেন, বাঘ অসুস্থ হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন। লক্ষণ বোঝার আগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। মৃত বাঘগুলোর দেহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে পুড়িয়ে ও কবর দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো অংশ অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যে প্রবেশ করতে না পারে।
ঘটনার পর ম্যা রিম শাখা ১৪ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জীবাণুমুক্তকরণ কার্যক্রম চলছে। সংক্রমিত ১০৮ জন কর্মীকে ২১ দিন স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
এই ট্র্যাজেডি আবারও থাইল্যান্ডের বাঘ-নির্ভর পর্যটন শিল্পের নৈতিকতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। পর্যটকদের জন্য ‘আপ-ক্লোজ’ অভিজ্ঞতা—বাঘ ও বাঘশাবকের সঙ্গে ছবি তোলা, স্পর্শ করা—এই ব্যবসার মূল আকর্ষণ। চীন, ভারত ও রাশিয়া থেকে আগত পর্যটকদের কাছে এটি জনপ্রিয় এবং প্রতিজনের জন্য ব্যয় ৩০ ডলারেরও বেশি।
কিন্তু প্রাণীকল্যাণ সংগঠনগুলোর মতে, এই মডেল মূলত বাঘদের দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্ব, সীমিত জেনেটিক বৈচিত্র্য ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। Wildlife Friends Foundation Thailand–এর প্রতিষ্ঠাতা এডউইন উইক বলেন, ইনব্রিডিংয়ের কারণে বাঘদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন রক্ত সংযোজন যথেষ্ট না হলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সংগঠন People for the Ethical Treatment of Animals (পিটিএ)–এর এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট জেসন বেকার আরও কঠোর ভাষায় বলেন, বন্দিত্ব ও মানসিক চাপের মধ্যেই বাঘগুলো জীবন কাটিয়েছে এবং সেই বাস্তবতাই তাদের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।
বর্তমানে থাইল্যান্ডে প্রায় ৬০টির বেশি স্থাপনায় ১,৫০০-এরও বেশি বন্দি বাঘ রয়েছে, যাদের অধিকাংশই পর্যটন শিল্পের জন্য প্রজনন করা। তবে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বন্য পরিবেশে। ২০২৪ সালের সরকারি হিসেবে দেশটির প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ১৭৯ থেকে ২২৩টি বন্য বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষত Myanmar সীমান্তবর্তী পূর্বাঞ্চলীয় বনাঞ্চলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্য বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে থাইল্যান্ড ইতিবাচক নজির স্থাপন করেছে।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পেয়েছে। Bangkok Post এবং South China Morning Postসহ একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি বিস্তৃতভাবে উঠে এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গণমৃত্যু কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় নয়; এটি থাইল্যান্ডের বন্যপ্রাণী নীতি, পর্যটন-নির্ভর প্রজনন মডেল এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন। সংরক্ষণ বনাম বিনোদন—এই দ্বন্দ্বে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
চিয়াং মাইয়ের এই ট্র্যাজেডি হয়তো নীতিনির্ধারকদের জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে ‘এন্টারটেইনমেন্ট’-এর আড়ালে ঢেকে রাখলে তার মূল্য একদিন ভয়াবহভাবেই পরিশোধ করতে হয়।






