সেনাবাহিনীর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের জীবন

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাবলম্বিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী–এর মানবিক উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির দুর্গম জনপদ। উন্নয়নের নতুন অধ্যায়।

বদিউল আলম লিংকন ও অসীম রায় (অশ্বিনী): তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরলস উদ্যোগে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও স্থানীয় জনগণের স্বাবলম্বনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটছে।

২৪ পদাতিক ডিভিশনের আওতাধীন সেনা রিজিয়নের মাধ্যমে চলমান ‘শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়ন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা দুর্গম পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রাকে আলোকিত করছে।

সেনাবাহিনী শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ক্রীড়া-যোগাযোগসহ সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষাসামগ্রী (ব্যাগ, খাতা, কলম, পেন্সিল, রাবার) বিতরণ, খেলাধুলার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং স্কুল যাতায়াত নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সম্প্রতি (২০২৫-২০২৬) বান্দরবানের রুমা, খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি ও রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকায় শিক্ষা উপকরণ ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় যুবকদের মধ্যে ক্রীড়া চর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা পারস্পরিক সম্প্রীতি জোরদার করছে।

স্বাস্থ্যসেবায় বড় অগ্রগতি: দুর্গম এলাকায় কোনো হাসপাতাল না থাকায় সেনাবাহিনীর মেডিকেল ক্যাম্পগুলো জীবনরক্ষাকারী হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার উলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে লংগদু আর্মি জোনের উদ্যোগে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্পে ২০০ জনের বেশি স্থানীয় (পাহাড়ি-বাঙালি) চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়েছেন। গাইনোকলজিস্ট মেজর তুরফা ও ক্যাপ্টেন নাভিদ নেওয়াজসহ সেনা চিকিৎসকরা সেবা দিয়েছেন এবং আর্থিক সহায়তাও প্রদান করা হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা আর্মি জোনের ক্যাম্পে ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। সেনা চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের নেতৃত্বে চলছে পার্বত্য সীমান্ত সড়ক প্রকল্প। দুর্গম এলাকায় যেখানে আগে দিনের পর দিন হাঁটতে হতো, সেখানে এখন ঘণ্টায় পৌঁছানো যাচ্ছে। পানির সমস্যা সমাধানে ১০০০-২০০০ লিটারের ট্যাঙ্কি স্থাপন, সৌর বিদ্যুৎ ও ছোট কারখানা স্থাপন করে স্থানীয়দের স্বাবলম্বী করা হচ্ছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর ও পরবর্তীতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা (সাবেক ও বর্তমান নেতৃত্ব) সরেজমিন পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রবীণ, হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। স্থানীয়রা এসব উদ্যোগকে ‘আশীর্বাদ’ বলে অভিহিত করছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আগে কেউ খোঁজ নিত না। এখন সেনাবাহিনী পাশে আছে—ওষুধ, বাচ্চাদের স্কুলের জিনিস, খেলার সামগ্রী, রাস্তা—সবকিছুতে সাহায্য করছে। আমরা খুব খুশি।”

সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’—এই নীতি অনুসরণ করে দুর্গম পাহাড়ে মানবিক সহায়তা চালিয়ে যাওয়া হবে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে পাহাড়ি জনগণের জীবনে নতুন আলো জ্বলছে, সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রমাণ করছে—তারা শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে না, জনকল্যাণ ও উন্নয়নেও নিবেদিত।

এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সকলের সহযোগিতা কাম্য। পাহাড় এখন আর অন্ধকারে নয়—সেনাবাহিনীর হাত ধরে এগিয়ে চলছে আলোর পথে।