মন্ত্রিসভায় মিনু: উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

মিজানুর রহমান মিনু ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন: স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় নেতৃত্বে আরেক ধাপ।

বদিউল আলম লিংকন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে মিজানুর রহমান মিনু ভূমি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর কাছে শপথ নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা গেজেট নোটিফিকেশন ও দায়িত্ব বণ্টনের তালিকায় তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়।

নতুন সরকারে মোট ৪৯-৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছেন।

রাজশাহীর জননেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ে

মিজানুর রহমান মিনু রাজশাহী অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি স্থানীয় নাগরিক সমাজের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেন।

১৯৯১ সালে তিনি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সরাসরি নির্বাচিত মেয়র হন (২১ মে ১৯৯১–১৯৯৩)। পরবর্তীতে ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত আরও দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ১৬ বছর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পার্ক ও সড়ক উন্নয়ন, নিকাশি ব্যবস্থা সংস্কার এবং নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের জন্য প্রশংসিত হন। “আধুনিক, নিরাপদ, গ্রিন, ক্লিন ও হেলদি রাজশাহী” ধারণার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।

বিএনপিতে দীর্ঘ সাংগঠনিক ভূমিকা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। দুই মেয়াদে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাজশাহী বিভাগে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত রাখতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়।

সংসদ সদস্য হিসেবে প্রত্যাবর্তন

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ (সদর) আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। নির্বাচনের পর তিনি চাঁদাবাজি ও জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং রাজশাহীকে “শান্তির শহর” হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার

ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের অন্যতম স্পর্শকাতর ও জটিল প্রশাসনিক খাত। ভূমি ব্যবস্থাপনা, রেকর্ড ডিজিটালাইজেশন, খাসজমি বন্দোবস্ত, নামজারি, দখলদার উচ্ছেদ এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি—এসব বিষয় এ মন্ত্রণালয়ের অধীন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিনুর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সরকারে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা ভূমি প্রশাসনে সংস্কার কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে।

বিশেষ করে ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দুর্নীতি কমানো এবং সেবাপ্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁর এ দায়িত্বপ্রাপ্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় পর্যায়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ মিজানুর রহমান মিনুর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। শপথ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে এবং গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন চূড়ান্ত হয়েছে। এখন দ্রুত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দেবে নতুন সরকার।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভূমি খাতে দৃশ্যমান সংস্কারই হবে মিনুর সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড।