নির্বাচন ও গণভোটে জামায়াতের উত্থান, বিশ্বজুড়ে নজর

জরিপে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বিএনপির কাছাকাছি অবস্থানে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট।
টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশের আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট ঘিরে দেশীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের (নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে) অধীনে অনুষ্ঠিত এই যৌথ ভোটে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান বিশ্ব পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে দেশ এই নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়ে এবার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে।
জামায়াতের নতুন জোট ও কৌশল
তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে পূর্বের জোট ভেঙে নিজস্ব ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে জামায়াত নিজেই। উল্লেখযোগ্যভাবে এতে যুক্ত হয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)—যা ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা যুব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি। জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে প্রায় ৩০টি আসনে সমঝোতা হয়েছে, যা তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ বাড়িয়েছে।
জোটের প্রধান মুখ জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা, কল্যাণমুখী রাজনীতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, জামায়াত ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা জোর করে শরিয়া চাপিয়ে দিতে চায় না; বরং “১৮ কোটি মানুষের বিজয়” নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
জরিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে
প্রাক-নির্বাচন বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে (প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট), তবে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটও খুব কাছাকাছি অবস্থানে (৪৩–৪৪ শতাংশ)। কিছু জরিপে জামায়াত ও তাদের মিত্রদের ১০৫টির বেশি আসনে নিশ্চিত জয় দেখানো হয়েছে, যা বিএনপির চেয়ে সামান্য বেশি বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের উত্থানের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে—
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অ্যান্টি-আওয়ামী ভোট বিভক্ত হওয়া, সংগঠিত দলীয় কাঠামো ও দুর্নীতিবিরোধী ইমেজ,
১৮–৩৭ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের (মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ) আকর্ষণ, বিশেষ করে এনসিপির সঙ্গে জোটের কারণে।
খুলনা, ফেনীসহ কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমিত হলেও সমর্থন, যেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতারা নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধের দাবি করছেন।
বিএনপি–জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্ক
এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। কোনো ঐক্য চুক্তি নেই। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যে এগোলেও জামায়াতকে “বিদেশি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত” বলে অভিযোগ করছে।
পাল্টা জবাবে জামায়াত বিএনপিকে ভারত-ঘনিষ্ঠ রাজনীতির অভিযোগে সমালোচনা করছে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনী সহিংসতা ও অস্ত্র মজুতের অভিযোগ ওঠায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্বমাধ্যমের উপস্থিতি
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই যৌথ ভোট পর্যবেক্ষণে মোট ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে উপস্থিত রয়েছেন বা হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা থেকে এসেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন, কমনওয়েলথের ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফআরইএল)-এর ২৮ জন, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর ১২ জনসহ আরও অনেকে।
এছাড়া ১৫০ জনের বেশি বিদেশি সাংবাদিক ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে কভারেজ করছেন, যার মধ্যে BBC, Reuters, AP, Al Jazeera English, NHK, Deutsche Welle উল্লেখযোগ্য।
ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের চিফ অবজারভার ইভার্স ইজাবসসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যে নির্বাচনী পরিবেশকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের তুলনায় এবারের পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি বিস্তৃত, যা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের উত্থান একদিকে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রভাব নিয়ে মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিরপেক্ষ, সহিংসতা-মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।






