বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র রেসিপ্রোকাল চুক্তি স্বাক্ষর: রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তি স্বাক্ষরিত: শুল্ক হ্রাসে রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা

টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ (এআরটি) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা আগের ২০ শতাংশ থেকে কম।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) দিয়ে তৈরি তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের বিস্তারিত

চুক্তিটি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাতে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান স্বাক্ষর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাম্বাস্যাডর জেমিসন গ্রিয়ার স্বাক্ষর করেন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি হাইব্রিড ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন থেকে অংশ নেন।

চুক্তিটি কার্যকর হবে উভয় দেশের সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পর। এটি প্রায় নয় মাসের আলোচনার ফল, যা গত বছরের এপ্রিল মাসে শুরু হয়। চুক্তির অধীনে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা (বাংলাদেশের পক্ষে সুবিধাজনক) কমাতে সাহায্য করবে।
শুল্ক হ্রাসের বিবরণ

সাধারণ শুল্ক

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি আগের ২০ শতাংশ থেকে কম, যা গত বছরের আগস্ট মাসে ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিশেষ সুবিধা

যুক্তরাষ্ট্র-উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের আরএমজি সেক্টরকে উৎসাহিত করবে, যা দেশের রপ্তানির প্রধান খাত।

অন্যান্য শর্ত- চুক্তিতে নন-ট্যারিফ বাধা (যেমন মান এবং সার্টিফিকেশন) অপসারণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মান এবং সার্টিফিকেশন গ্রহণ করবে, যা আমদানি সহজতর করবে।

এই চুক্তির উদ্ভব গত বছরের এপ্রিল মাসে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০০টি দেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের জন্য প্রাথমিক শুল্ক হার ছিল ৩৭ শতাংশ, যা পরে তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। আলোচনার পর গত বছরের ২ আগস্ট এটি ২০ শতাংশে নামানো হয় এবং ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আগেই শুল্ক হ্রাসের আশা প্রকাশ করেছিলেন, বলেছিলেন যে আলোচনার ভিত্তিতে এটি নির্ধারণ করা হবে।

চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আরএমজি খাতের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, এবং এই শুল্ক হ্রাস রপ্তানি বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তবে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পণ্য আমদানি করতে হবে, যা দেশীয় শিল্পকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রতিক্রিয়া এবং উদ্বেগ

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস চুক্তিকে “ঐতিহাসিক” বলে অভিহিত করেছেন, বলেছেন যে এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে। তবে, ব্যবসায়ী নেতারা চুক্তির ‘গোপনীয়তা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলী প্রকাশ না করে স্বাক্ষর করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার অভাব নির্দেশ করে।

বিজিএমইএ-এর মতো সংগঠন চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু—যুক্তরাষ্ট্রীয় তুলা ব্যবহার করে শূন্য শুল্ক—যাতে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিতে পারে।

এই চুক্তি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে স্বাক্ষরিত হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ, তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে হবে।