“ছুটি চাইছিলাম, পাইলাম না; আমার ছেলেটা মারা গেল!!!”: ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ

ছবি: সংগৃহিত, ইত্তেফাক

ছুটি চেয়েও পেলেন না: সন্তানের মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এক পুলিশ বাবার অসহায় আকুতি।

টুইট প্রতিবেদক: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালনের অজুহাতে ছুটি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হৃদয়বিদারক এক পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য মেহেদি হাসান। সন্তানের অসুস্থতা ও মৃত্যুর মতো চরম ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্যেও ছুটি না দেওয়ার এই অভিযোগ দেশজুড়ে মানবিক প্রশ্ন ও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন,

“ছুটি চাইছিলাম, পাইলাম না; আমার ছেলেটা মারা গেল!!!”

এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে একজন বাবার অসীম যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর ভেঙে পড়া আত্মা। দায়িত্বের চাপে একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানকে হারানোর খবর নিয়েও কর্মস্থলে আটকে থাকেন—এই প্রশ্ন আজ পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে।

একই পোস্টে তিনি আরও লেখেন,

“ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ, আমি না থাকলে নির্বাচন আটকে যেতো!! কী জবাব দিবো বউকে??”

এই কথাগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশার প্রকাশ। নির্বাচন কি একজন সন্তানের জীবনের চেয়েও বড়? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি মানবিকতার ঊর্ধ্বে?

এর প্রায় এক ঘণ্টা পর দেওয়া আরেকটি পোস্টে মেহেদি হাসান জানান, তার স্ত্রী তখনো সন্তানের মৃত্যুর খবর জানেন না। চিকিৎসকদের পরামর্শে খবরটি গোপন রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি রাতের ডিউটি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সন্তানের মরদেহ তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সহায়তার আবেদন জানান—যা পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

পরবর্তী পোস্টগুলোতে তিনি নিজের আর্থিক ও পারিবারিক অসহায়তার কথাও তুলে ধরেন। চাকরিটি তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এই ঘটনার পর মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন বলে জানান তিনি। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বিকল্প কাজের সন্ধানের কথাও লেখেন—যা একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর চরম হতাশার প্রতিচ্ছবি।

শেষ পর্যন্ত আরেকটি পোস্টে তিনি জানান, তার সন্তান আর এই পৃথিবীতে নেই। সেই শোক বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

জানা যায়, মেহেদি হাসান ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে কর্মরত এবং তার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। দীর্ঘ চাকরিজীবনে দায়িত্ব পালনের নজির থাকলেও ব্যক্তিগত এই চরম সংকটে তিনি পাননি ন্যূনতম মানবিক সহানুভূতি।

মানবিক প্রশ্ন ও শাস্তির দাবি

এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ পুলিশের কোন বিধি, কোন আইনে বলা আছে যে, অসুস্থ বা মৃত্যুপথযাত্রী সন্তানের জন্যও ছুটি দেওয়া যাবে না? নির্বাচনকালীন দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কি মানবিকতা, পরিবার ও মৌলিক অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার লাইসেন্স দেয়?

এই ঘটনার জন্য যিনি বা যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েও ছুটি অনুমোদন দেননি, তা স্পষ্টতই দায়িত্বহীনতা ও মানবিক অবহেলা। শুধু নৈতিক নয়, প্রশাসনিকভাবেও এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

মানবিক এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে জোরালোভাবে দাবি উঠছে, বিষয়টির তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।

ছুটি না দিয়ে দায়িত্ব অবহেলা করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ভবিষ্যতে এমন অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশ বাহিনীর ছুটি ও কল্যাণ নীতিতে স্পষ্ট মানবিক নির্দেশনা যুক্ত করতে হবে।

একজন পুলিশ সদস্য শুধু রাষ্ট্রের রক্ষক নন—তিনি আগে একজন বাবা, একজন স্বামী, একজন মানুষ। রাষ্ট্র যদি তার মানুষের মানবিক কষ্ট বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়।