যুদ্ধের দামামা: ইরানকে রক্ষায় প্রস্তুত হাজার হাজার ইরাকি

ছবি: সংগৃহিত

দিয়ালা প্রদেশে সমাবেশ, ইরান রক্ষায় প্রস্তুতির বার্তা দিল ইরানপন্থি গোষ্ঠী। মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা, বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা।

টুইট প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কা ঘিরে এবার প্রকাশ্যে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন হাজার হাজার ইরাকি নাগরিক।

ইরাকের দিয়ালা প্রদেশে অন্তত ৪,৯৪৭ জন একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে জানিয়েছেন—ইরানের ওপর হামলা হলে তারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দেশটিকে রক্ষায় অংশ নিতে প্রস্তুত।

এই ঘোষণা আসে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দিয়ালা প্রদেশের আবু সাইদা সাব-ডিস্ট্রিক্টে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশ থেকে। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা ইরান ও ইরাকের মধ্যে “ভাইচারা ও প্রতিরোধের বন্ধন”-এর কথা উল্লেখ করেন।

‘বিনা পারিশ্রমিকে’ লড়াইয়ের ঘোষণা

মিডল ইস্ট আই, রুদাও ও জিরোহেজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারীরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী, পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF) এবং ইরানকে রক্ষা করতে বিনা পারিশ্রমিকে লড়াই করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তারা যেকোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার কথাও ঘোষণা করেছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হলে তা শুধু একটি দেশের ওপর আক্রমণ হবে না, বরং পুরো অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তির ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হবে।

আলোচনা চললেও বাড়ছে সংঘাতের ছায়া

এই ঘোষণার সময়ই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলমান। ওমানের রাজধানী মাসকাতে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আলোচনাকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি “ভালো শুরু” বলে উল্লেখ করলেও, এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।

অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আসবে না।

ট্রাম্পের হুমকি, তেহরানের পাল্টা বার্তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার ইরানে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “সময় ফুরিয়ে আসছে” এবং “পরবর্তী হামলা হবে আরও ভয়াবহ”।

ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই এবং দেশটির সামরিক মুখপাত্ররা সতর্ক করে বলেন, ইরানে হামলা হলে তা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও নিরাপদ থাকবে না।

ইরান ইতোমধ্যে তাদের সামরিক নীতিকে ‘অফেনসিভ ডকট্রিন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সামরিক তৎপরতা ও ইসরায়েলের অবস্থান

এই উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ আরব সাগরে মোতায়েন করেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে মার্কিন বাহিনী দাবি করে, একটি ইরানি ড্রোন ক্যারিয়ারের কাছাকাছি এলে সেটি ভূপাতিত করা হয়।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানে সরকার পতনের “পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে”, যা অঞ্চলটির অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ইরাকের ভূমিকা ও বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের এই স্বেচ্ছাসেবী ঘোষণাটি মূলত ইরান-সমর্থিত PMF গোষ্ঠীগুলোর উদ্যোগ। ইরাক সরকার সরাসরি এতে জড়িত নয়। বিশেষ করে শিয়া-প্রধান দিয়ালা প্রদেশে ইরানের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী।

এর আগেও কাতাইব হিজবুল্লাহ ও বদর অর্গানাইজেশনসহ একাধিক ইরাকি গোষ্ঠী প্রকাশ্যে ইরানকে সমর্থন জানিয়েছে।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা—সিদ্ধান্তের মুখে মধ্যপ্রাচ্য

সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী (৮ ফেব্রুয়ারি), আলোচনা চললেও কোনো চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনায় ব্যর্থতা এলে মধ্যপ্রাচ্য একটি বড় যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে।

ইরানকে ‘পেপার টাইগার’ ভাবা ভুল হবে—কারণ দেশটির রয়েছে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, যা হামলার জবাবে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তবে আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘনাচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রুদাও, জিরোহেজ, রয়টার্স, আল জাজিরা, আইএসডব্লিউ