অর্থনীতি থেকে এআই—বিএনপির ইশতেহারে বড় রূপরেখা

পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠন, এআই হাব তৈরির পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ও চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ার অঙ্গীকার বিএনপির ইশতেহারে।
টুইট প্রতিবেদক: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নীতি ও কাঠামোগত বাধা দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
ঘোষিত ইশতেহারে দেশের অর্থনীতি, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, সুনীল অর্থনীতি, আঞ্চলিক উন্নয়ন, ধর্ম-সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম—প্রায় সব খাতেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
পুঁজিবাজার সংস্কারে কঠোর অবস্থান
পুঁজিবাজার নিয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে ইশতেহারে বলা হয়, এই খাত সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম ও জালিয়াতি তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইশতেহারে আরও বলা হয়, অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের লক্ষ্য
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে বিএনপি ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সময়ে সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়।
ইশতেহারে ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার করা হয়। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রচেষ্টা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
আইসিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অগ্রাধিকার
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতকে বিএনপির বিশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইশতেহারে বলা হয়, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি অন্যতম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
উদ্ভাবন ও আইসিটি পরিষেবা রপ্তানিকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশের জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
সুনীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি জানায়, দেশের বিপুল সম্ভাবনাময় সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইশতেহারে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রভিত্তিক শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্বারোপের কথা বলা হয়।
এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতে মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
এছাড়া করের বোঝা না বাড়িয়েই ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়।
আঞ্চলিক ভারসাম্য ও চট্টগ্রাম পরিকল্পনা
ইশতেহারের চতুর্থভাগে দেশের সব অঞ্চলে সমতা-ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে বিএনপি। দলটির দাবি, যে অঞ্চল যে ধরনের অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, সে অঞ্চলকে সেই অনুযায়ী অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এবং অঞ্চলটিকে কর্মসংস্থানের হাব হিসেবে উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়।
ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
পঞ্চম ভাগে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংহতি বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয়। ইশতেহারে নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইসলামী গবেষণা সম্প্রসারণ এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত করার কথা বলা হয়।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বিএনপি জানায়, জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা হবে।
এছাড়া জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ‘স্পোর্টস ইকোনমি’ সম্প্রসারণ এবং ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’-তে গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। দেশে একটি আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিক কল্যাণ
গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি কাজ করবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়। সাংবাদিকদের কল্যাণে নানামুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ‘জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ইশতেহার অনুষ্ঠানের উপস্থিতি
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনায় ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক আ ন ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আগের ইশতেহার ঘোষণার ইতিহাস
পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করেছিল।
বিএনপির ঘোষিত ইশতেহার দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও অনিয়ম তদন্তের অঙ্গীকার দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটাতে সহায়ক হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নে গতি আনতে পারে।
এআই ও আইসিটি খাতে অগ্রাধিকার ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি সুনীল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের পরিকল্পনা কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।






