এপস্টেইন ফাইল ঘিরে গুজব: বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসল সত্য কী?

এপস্টেইন ফাইল ও বাংলাদেশ: ভুয়া দাবি, বাস্তব তথ্য ও জনসচেতনতার প্রয়োজন।
টুইট প্রতিবেদক: সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বহুল আলোচিত ‘এপস্টেইন ফাইল’-এ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কিংবা দলের শীর্ষ নেতাদের নাম উঠে এসেছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত সব সরকারি নথি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে—এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (DOJ) প্রকাশিত মিলিয়ন পৃষ্ঠার নথি, ইমেইল, ছবি ও ভিডিওতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাক্তি বা উচ্চপদস্থ নেতার নাম একবারও উল্লেখ নেই।
এপস্টেইন ফাইল মূলত জেফ্রি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্তসংক্রান্ত দলিলের সংকলন, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের নাম এসেছে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নথিতে নাম থাকা মানেই তা অপরাধের প্রমাণ নয়। তদন্ত-সংক্রান্ত যোগাযোগ, ইমেইল বা প্রস্তাবনামূলক আলোচনায় অনেক নাম উঠে আসতে পারে, যা আইনি দায় বা অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত নয়। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে জড়ানোর চেষ্টা স্পষ্টতই বিভ্রান্তিকর।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে এপস্টেইন ফাইলে যে সীমিত তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর একটি উল্লেখ। ২০১৪ সালের একটি ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রোবায়োটিক গবেষণায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছিল।
এটি ছিল একটি বৈজ্ঞানিক ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আলোচনা, যার সঙ্গে কোনো ধরনের অপরাধ, যৌন নির্যাতন বা অবৈধ কার্যক্রমের সম্পর্ক নেই। সংশ্লিষ্ট ইমেইল ও নথিতে কোথাও icddr,b-এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
এছাড়া কিছু রাজনৈতিক মহলের প্রচারে বলা হচ্ছে, বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী আবদুল আওয়াল মিন্টুর নামও এপস্টেইন ফাইলে এসেছে। বাস্তবে দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনের ২০০৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় একজন দাতা ছিলেন। একই প্রচারণায় জেফ্রি এপস্টেইনও আলাদা ভাবে অনুদান দিয়েছিলেন। তবে এই দুই ব্যক্তির মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ, সম্পর্ক বা যৌথ কার্যক্রমের প্রমাণ নেই। এটি শুধুমাত্র একটি ডোনার লিস্টের তথ্য, যা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
একইভাবে শেখ হাসিনা কিংবা নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নামও কিছু নথিতে প্রাসঙ্গিক বা প্রাসঙ্গিকহীন কথোপকথনে ‘ইনসিডেন্টাল মেনশন’ হিসেবে এসেছে। কিন্তু এসব উল্লেখের সঙ্গে কোনো অপরাধ, অভিযোগ বা এপস্টেইনের অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নামগুলো জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তিকর গল্প তৈরি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক অভিযোগ, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে এলে ভুয়া খবর, ডিপফেক ভিডিও, পুরনো ছবি নতুনভাবে উপস্থাপন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে বানানো কনটেন্টের বিস্তার বেড়ে যায়। এসব মিথ্যা তথ্য শুধু ব্যক্তি বা দলের সুনাম ক্ষুণ্ন করে না, বরং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও জনমতকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে যে কোনো বড় বা চাঞ্চল্যকর দাবি দেখলে তার উৎস যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের অফিসিয়াল নথি, বিবিসি, আল জাজিরা, রয়টার্স, এপি কিংবা স্বীকৃত ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, স্ক্রিনশট বা অজ্ঞাত ব্লগের তথ্য যাচাই ছাড়া শেয়ার করা মিথ্যা ছড়ানোরই শামিল।
সবশেষে বলা যায়, এপস্টেইন ফাইলকে কেন্দ্র করে বিএনপি বা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনোটি এখন পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক বা প্রমাণিত নয়। এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।
সত্য যাচাই, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ এবং সচেতন অবস্থানই পারে মিথ্যার বিরুদ্ধে সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে।






