আয়নাঘরে ৮ বছর: আযমী জানালেন ভারতবিরোধী লেখালেখির কারণে নির্যাতন

ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে আযমী: সেনাবাহিনীর ৩০ বছরের চাকরিতে শিখিয়েছে—ভারত আমাদের প্রধান শত্রু।
টুইট প্রতিবেদক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ আট বছর ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা আয়নাঘরে গুম করে রাখা হয়। এ সময়ে জিজ্ঞাসাবাদে ভারতের বিরুদ্ধে কেন লেখালেখি করেন—এ নিয়ে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে তিনি জানান, ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি যদি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হোক। অবৈধভাবে আটক রাখার কারণ কী—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। জবানবন্দিতে আযমী বলেন, “সেনাবাহিনীর ৩০ বছরের চাকরিতে আমাকে শিখিয়েছে—ভারত আমাদের প্রধান শত্রু। এটা যদি অপরাধ হয়, তাহলে সবাই একই অপরাধে অপরাধী। যে সব সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল ৩০ বছর ধরে শিখিয়েছেন, তারাও সমান অপরাধী।”
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন তিনি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রথম দিনের জবানবন্দি অসমাপ্ত থাকায় সোমবার অবশিষ্ট অংশ উপস্থাপন করেন আযমী।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তার আটক কক্ষে শত শত ছারপোকা ছিল। ছারপোকার কামড়ে কাপড়চোপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ আদায়ে সমস্যার কথা জানিয়ে পৃথক লুঙ্গি চাইলে তা দেওয়া হয়নি। আগে দেওয়া লুঙ্গি ছিল নিম্নমানের এবং ব্যবহারের ফলে ছিঁড়ে যায়। ছেঁড়া জায়গা সেলাই করতে করতে দরজিও আর সেলাই করতে রাজি হননি। হাতে সেলাই করার জন্য সুতা চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট দিয়ে ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন, অপহরণের এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা তাকে জানান, একটি অঘটনের আশঙ্কায় তাকে আনা হয়েছিল এবং সে আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় মুক্তির সময় এসেছে। তখন তিনি জানতে চান, মুক্তির জন্য দিন না ঘণ্টা গুণবেন। জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমি একজন জেনারেল। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন, আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।”
আযমী বলেন, ২০২২ সালের এক জিজ্ঞাসাবাদে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিচয় ও কথাবার্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কি-না। তিনি বলেন, “আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর অপহরণ করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে আপনাদের গোয়েন্দা বাহিনী আমার পেছনে ছিল। জামায়াতের সঙ্গে আমার ন্যূনতম সম্পর্কের কোনো রিপোর্ট কি আপনাদের কাছে আছে?”
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য দলের মতো জামায়াতে ইসলামীতে কি উত্তরাধিকার সূত্রে নেতা হয়—সে প্রশ্নও তিনি তোলেন। এরপরও তাকে জামায়াতের আমির হতে যাচ্ছেন—এ কথা স্বীকার করাতে চাপ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
আযমী বলেন, তার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও তার সঙ্গে ওই দলের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক না থাকলে দলের আমির হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এরপর ভারতের বিরুদ্ধে তার লেখালেখি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদকারীরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তিনি প্রশ্ন করেন, তাকে কি মেরে ফেলা হবে। জবাবে তারা বলেন, “মেরে ফেলতে চাইলে তো আরও আগেই মেরে ফেলতে পারতাম।”
জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন। জেরার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ সাবেক-বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত। আযমী তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দি দেন।
আবদুল্লাহিল আমান আযমী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট আয়নাঘর থেকে মুক্তি পান। গণ-অভ্যুত্থান/অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের পর তাকে ও অন্যান্য গুম হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হয়। জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সূত্রে তার ফিরে আসার খবর নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তার বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে অবসরপ্রাপ্ত হিসেবে সুবিধা দেয়।
সূত্র: আমারদেশ






