বিএনপির মনোনয়ন ধস: কেন যাচাই হয়নি যোগ্যতা?

বিএনপির বিতর্কিত মনোনয়ন লিস্ট। লয়ালিটি, প্রার্থী ত্রুটি ও ইসির ভূমিকা নিয়ে দলীয় চাপ।
বদিউল আলম লিংকন: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যে বিতর্কিত প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে, তা রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ঋণ খেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব, মামলার তথ্য গোপনসহ নানা অভিযোগের কারণে একের পর এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হচ্ছে।
সারাদেশে মোট ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে (নির্বাচন কমিশন সূত্রে), যার মধ্যে বিএনপির ২৭-৩৩ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন। বিএনপি প্রায় ২৮৫-২৮৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে, কিন্তু আইনি বাধা ও আপিল শুনানির কারণে অনেকেই অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।
বিএনপির মধ্যে চলমান বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে শেষ ভরসা দলের কার্যকর নেতৃত্ব ও সুশৃঙ্খল নেতা তারেক জিয়া। ভোটাররা দলের নীতি, প্রার্থী নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তার ওপর চোখ রাখছেন তিনি।
দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, প্রার্থী নির্বাচনের ত্রুটি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ইসির ভূমিকা মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলের হাইকমান্ড ও প্রভাবশালী নেতাদের অগ্রাধিকার প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ে বাধা সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লা-৪ আসনে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা ঋণ খেলাপির কারণে বাতিল হয়েছে, আর কুমিল্লা-১০ আসনে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বাতিল হয়েছে। তৃণমূল নেতাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনের তাড়াহুড়োর কারণে বিএনপি প্রার্থীদের যথাযথ যাচাই না করেই মনোনয়ন দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে মামলার তথ্য গোপন রাখা হয়েছে, আবার ঋণ খেলাপি ও অন্যান্য সামাজিক ও আইনি ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়নি।
উদাহরণস্বরূপ, ময়মনসিংহ-৭ আসনে মো. মাহাবুবুর রহমান লিটনের মনোনয়ন প্রথমে বাতিল হয়েছিল, পরে আপিলের মাধ্যমে ফিরে পান। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ইসির কঠোরতা কিছুটা পক্ষপাতমূলক মনে হচ্ছে।
ইসির ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিএনপি অভিযোগ করছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কিছু ক্ষেত্রে সরকারপন্থী প্রার্থীদের জন্য সহনশীলতা প্রদর্শিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মাসুদুজ্জামান মাসুদ সরে দাঁড়ান। দল বলছে, বিতর্কিত মনোনয়ন নয়, বরং নির্বাচন কমিশনের কঠোরতাই প্রার্থীর অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলের প্রার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতার অভাবই মূল সংকট।
দলের অভ্যন্তরীণ চাপ ও মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ২৮টি আসন মিত্রদের (যেমন জামায়াত) জন্য ফাঁকা রেখেছে, যা প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলেও বিতর্কিত প্রার্থীদের কারণে দলের সুনাম ও ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নেতারা বলছেন, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও তৃণমূলে হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপির করণীয় হলো দলের একতা বজায় রাখা, প্রার্থী যাচাই প্রক্রিয়া শক্ত করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। বিশেষভাবে দলের নেতা তারেক জিয়াকে সাহস ও নেতৃত্ব প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে দলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন করা যায়। দলের সকল নেতাকে সতর্ক থাকতে হবে যে আইন ও আপিল শুনানির ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় থাকবে। এছাড়া ভোটারদের বিভ্রান্তি কমাতে দলকে সঠিক বার্তা ও স্বচ্ছ প্রচারণা চালাতে হবে।
সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, কুমিল্লা-৪ ও কুমিল্লা-১০ আসনে দুই বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়েছে। মোট বাতিলের সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও নির্বাচনী মাঠে দলের হেভিওয়েট নেতাদের আইনি বাধার কারণে অংশগ্রহণ সীমিত। তবে দলের শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রচেষ্টা অব্যাহত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই এবং দলের একতা বজায় রাখলে নির্বাচন সামনে আসলেও দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সক্ষম এবং ভোটার আস্থা অর্জনে সাফল্য পেতে পারে। সাধারণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত শুধু দলের নাম বা প্রতীক দেখে ভোট দেবেন না। তারা দেখবেন দলের নেতৃত্ব কতটা দক্ষ, নীতি কতটা সৎ, এবং প্রার্থীদের আচরণ ও সততা কতটা গ্রহণযোগ্য।






