উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে ভারতের রাজনীতিতে শোক

মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু।
বিশ্ব ডেস্ক: ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার (৬৬) একটি প্রাইভেট জেট বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা চারজন সহযাত্রীও প্রাণ হারিয়েছেন। বিমানটি মুম্বাই থেকে পুনে জেলার বারামতী যাওয়ার পথে অবতরণের চেষ্টাকালে বিধ্বস্ত হয়েছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় লিয়ারজেট ৪৫ মডেলের বিমানটি (রেজিস্ট্রেশন নম্বর VT-SSK) মুম্বাই থেকে সকাল ৮:১০ মিনিটে উড্ডয়ন করে। প্রায় ৪৫ মিনিট পর বারামতী বিমানবন্দরে দ্বিতীয়বার অবতরণের চেষ্টাকালে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রানওয়ের কাছে পাহাড়ি এলাকায় আছড়ে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বিস্ফোরণের মতো শব্দ এবং ধোঁয়া দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। বিমানবন্দরটি অনিয়ন্ত্রিত (আনকন্ট্রোল্ড), যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা নেই। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভায়, কিন্তু কোনো যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। অজিত পাওয়ারের দেহ তার হাতঘড়ি দিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে। বিমানটি ভিএসআর ভেঞ্চারস প্রাইভেট লিমিটেডের মালিকানাধীন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত অজিত পাওয়ার (ডানে)
নিহতদের পরিচয়
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন- অজিত পাওয়ার (উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং এনসিপি নেতা), তার সুরক্ষা কর্মকর্তা বিধিপ জাধব, ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট পিঙ্কি মালি, পাইলট ক্যাপ্টেন শম্ভবী পাঠক এবং কো-পাইলট ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুর। ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (ডিজিসিএ) নিশ্চিত করেছে যে কোনো যাত্রী বেঁচে নেই।
দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ এবং বিমানের ইতিহাস
দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে প্রাথমিকভাবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। বিমানটি ১৯৯০-এর দশকে তৈরি এবং এর নিরাপত্তা রেকর্ড সন্তোষজনক নয়। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুম্বাই বিমানবন্দরে এই একই বিমানটি ভারী বৃষ্টিতে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল, যাতে কো-পাইলট গুরুতর আহত হয়েছিলেন। বিমানটি মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়েছিল, এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিজিসিএ-র শেষ অডিট হয়েছে। অপারেটর দাবি করেছে বিমানটি ‘টপ-নচ’ কন্ডিশনে ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দুর্ঘটনার মুহূর্ত ধরা পড়েছে।
ভারতের অ্যায়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) এবং ডিজিসিএ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিমানের ব্ল্যাক বক্স এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করছে। সিভিল অ্যাভিয়েশন মিনিস্টার কে রাম মোহন নাইডু বলেছেন, তদন্ত পুরোপুরি সম্পন্ন হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট-তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি করেছেন এবং ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া
মহারাষ্ট্র সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, যাতে সরকারি অফিস, স্কুল বন্ধ থাকবে এবং পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস বারামতী পৌঁছে শোক প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, “অজিত দাদা আমার বন্ধু ছিলেন।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফড়নবীসের সঙ্গে কথা বলে শোক জানিয়েছেন। রাহুল গান্ধী, নিতিন গড়করি এবং অন্যান্য নেতারা সংসদে এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এনসিপি কর্মীরা হাসপাতালের বাইরে জড়ো হয়ে শোক প্রকাশ করছেন, এবং বারামতীতে শাটডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া
অজিত পাওয়ারের কাকা শরদ পাওয়ার মুম্বাই থেকে বারামতী পৌঁছেছেন। তার স্ত্রী সুনেত্রা, ছেলেরা পার্থ ও জয় দিল্লি থেকে রওনা হয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সুপ্রিয়া সুলে এবং সুনেত্রা পাওয়ারও পরিবারের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
অজিত পাওয়ারের রাজনৈতি
অজিত পাওয়ার ছিলেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি বারামতী থেকে সাতবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী হন। বারামতী ছিল তার রাজনৈতিক শক্তিঘাঁটি, এবং এই দুর্ঘটনা মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনার সময় তিনি জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রচারণায় যাচ্ছিলেন।
তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে দেশ, এবং শোকাহত পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।






