উন্নত মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেমের সফল পরীক্ষা তদারকি করলেন কিম জং উন

ছবি: এক্স

৩৫৮ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত, আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা

টুইট প্রতিবেদক: উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সোমবার (২৭ জানুয়ারি ২০২৬) একটি উন্নত বড় ক্যালিবারের মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেম (MRLS)-এর সফল পরীক্ষা তদারকি করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (KCNA) জানিয়েছে, পরীক্ষায় চারটি রকেট লঞ্চ করা হয়, যা প্রায় ৩৫৮.৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে অবস্থানরত নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে।

KCNA-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই এমআরএলএস ব্যবস্থায় একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। এতে রকেটের গতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণক্ষমতা এবং আঘাতের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিম জং উন বলেন, এতে একটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দেশিত (self-steered) প্রিসিশন ফ্লাইট সিস্টেম রয়েছে, যা বাইরের হস্তক্ষেপ—বিশেষ করে GPS জ্যামিং—উপেক্ষা করেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

কিম জং উন জানিয়েছেন, এই সিস্টেমটি “specific attacks”-এর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। তার ভাষায়, এতে অস্ত্রের সর্বোচ্চ শক্তি সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তবে কিসের লক্ষ্যবস্তু বা আক্রমণের ধরণ বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। পরীক্ষার ছবিতে কিম জং উনের সঙ্গে তার কন্যা কিম জু একেও উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।

কিম আরও বলেন, এই পরীক্ষা দেশের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা (strategic deterrent) জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, এটি পারমাণবিক হুমকির বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি, আসন্ন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়া (WPK)-এর নবম কংগ্রেসে দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধের পরবর্তী ধাপের কৌশল ও পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী আগের দিনই পিয়ংইয়ং-এর উত্তরে একাধিক স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণের তথ্য জানিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ওই উৎক্ষেপণ এবং নতুন এমআরএলএস পরীক্ষার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পরীক্ষিত এই সিস্টেমটি সম্ভবত ৬০০ মিলিমিটার ক্যালিবারের KN-25 ‘সুপার-লার্জ’ এমআরএলএস-এর উন্নত সংস্করণ, যার সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম। কিছু বিশ্লেষকের মতে, “specific attacks” শব্দবন্ধের অর্থ হতে পারে ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সম্ভাবনা।

কিছু সামরিক বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন সিস্টেমে রাশিয়া-উৎপত্তির মিলিটারি-গ্রেড GPS প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে সক্ষম। তবে উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কোরীয় উপদ্বীপে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে

উন্নত এমআরএলএস পরীক্ষার ফলে কোরীয় উপদ্বীপে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা বিশিষ্ট এই সিস্টেম দক্ষিণ কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি কেবল কনভেনশনাল হুমকি নয়, ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে পারে। “specific attacks” শব্দবন্ধের মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বল্প সময়ে আঘাতের ধারণা বোঝানো হচ্ছে, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী করতে পারে, যা উত্তরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোতে প্ররোচিত করতে পারে।

এছাড়া জাপানও বাড়তি সতর্ক অবস্থানে যেতে পারে। কারণ এই ধরনের স্বল্প-পাল্লার ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাগুলো জাপান সাগর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই অস্ত্র উন্নয়ন কোরীয় উপদ্বীপে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক স্থবিরতা ও উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সূত্র: KCNA, Reuters, Yonhap, Bloomberg, The Korea Times (২৮ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য)