পাহাড়ে একটি সেতু, হাজারো স্বপ্ন: নোয়াপতংয়ের ১২ গ্রামের গল্প

দশকের পর দশক ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার জীবন শেষে নোয়াপতংয়ের মানুষ দেখছে স্বস্তির আলো—৮০ মিটার সেতু বদলাবে ১২ গ্রামের ভাগ্য, গতি পাবে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা।
বান্দরবান থেকে | অসীম রায় অশ্বিনী: নোয়াপতং খাল—শুধু একটি জলধারা নয়, বছরের পর বছর ধরে এটি ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর সীমাহীন দুর্ভোগের নাম। বর্ষা এলেই ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই খাল পার হতে গিয়ে কত মায়ের চোখে জল, কত শিশুর স্কুল ছুটে যাওয়া, কত রোগীর সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া—তার হিসাব নেই।
সেই নোয়াপতং খালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ৮০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু এখন তাই শুধু কংক্রিট আর রডের স্থাপনা নয়, এটি হয়ে উঠেছে ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষের স্বপ্নের প্রতীক।

ছবি: নিজস্ব
বান্দরবান সদর উপজেলার দুর্গম নোয়াপতং ইউনিয়নের এই জনপদে যোগাযোগ মানেই ছিল ঝুঁকি। বর্ষাকালে নৌকা, শুকনো মৌসুমে হেঁটে কিংবা বাঁশের সাঁকো—প্রতিটি পথেই লুকিয়ে থাকত বিপদ। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারত না, গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে গেলে শুরু হতো মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। অতীতে খাল পার হতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও স্থানীয়দের মনে আজও দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।
এই বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে নোয়াপতং খালের ওপর ৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি। চালু হলে এটি সরাসরি উপকার দেবে অন্তত ১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষকে। সেতুর পিলারগুলো যেন শুধু খালের বুক চিরে দাঁড়িয়ে নেই—এগুলো দাঁড়িয়ে আছে ভরসা, নিরাপত্তা আর আগামীর আশার প্রতীক হয়ে।
নোয়াপতংয়ের কৃষকরা বলেন, এতদিন উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে গিয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এখন সেই দুশ্চিন্তা কমবে। সহজে বাজারে পৌঁছানো যাবে সবজি, ফল আর পাহাড়ি কৃষিপণ্য। শিক্ষার্থীদের চোখেও নতুন স্বপ্ন—নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, ভালো ফল করা, একদিন পাহাড় ছাড়িয়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা চনুমং মারমার কণ্ঠে আবেগ ঝরে পড়ে,
“এই সেতু আমাদের জন্য শুধু রাস্তা নয়। বর্ষা এলেই যে ভয় বুকের ভেতর জমে থাকত, সেটার অবসান হবে। আমাদের সন্তানরা আর ঝুঁকি নিয়ে খাল পার হবে না—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি।”
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই সেতু হবে জীবনরক্ষাকারী। জরুরি সময়ে আর খাল থামিয়ে দেবে না অ্যাম্বুলেন্স, থামাবে না প্রসূতি মায়ের হাসপাতাল যাত্রা। বৃদ্ধ, অসুস্থ আর শিশুরা পাবে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মোহাম্মদ ইয়াছির আরাফাত বলেন,
“নোয়াপতংয়ের মানুষ বহু বছর ধরে যে ঝুঁকি নিয়ে জীবন কাটিয়েছে, এই সেতু তার অবসান ঘটাবে। এটি শুধু যোগাযোগ নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, মেসার্স মারমা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সব কাজ সম্পন্ন হলে খুব শিগগিরই সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
নোয়াপতংয়ের মানুষ এখন প্রতিদিন সেতুর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে। অপেক্ষা একটি দিনের—যেদিন উদ্বোধনের ফিতা কাটার সঙ্গে সঙ্গে কেটে যাবে বছরের পর বছরের বিচ্ছিন্নতা। তখন এই সেতু শুধু দুই পাড়কে যুক্ত করবে না, যুক্ত করবে স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর একটি নিরাপদ আগামীর পথ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মেসার্স মারমা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এপ্রোচ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব কাজ সম্পন্ন হলে শিগগিরই সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।






