চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে চলছে আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভের ধর্মীয় মহামিলন

বাঁশখালীর ঋষিধামে আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা: মানবতার মিলনমেলায় ২২তম আসর
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জঙ্গল কোকদণ্ডী এলাকায় অবস্থিত ঋষিধাম (হৃষিধাম বা Rishidham) বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। এখানে প্রতি তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা। বাংলাদেশের একমাত্র কুম্ভমেলা যা ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
ভারতের প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, নাসিক ও উজ্জয়িনীর ঐতিহাসিক কুম্ভমেলার আদলে আয়োজিত এই মেলাকে ভক্তরা আখ্যায়িত করেন “মানবতার মিলন মেলা” হিসেবে। হরিকথামৃত শ্রবণ, সাধু-সন্ন্যাসীদের দর্শন, নামকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা এবং পবিত্র স্নানের মধ্য দিয়ে মেলাটি হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও মানবিক ঐক্যের প্রতীক।

ছবি: সাংবাদিক অসীম রায় (অশ্বিনী)
ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠা
ঋষিধামের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ (জন্ম: ১৯০৩ খ্রি., বাণীগ্রাম, বাঁশখালী)। তিনি তাঁর গুরু শ্রীমৎ স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজের নির্দেশনায় ১৯৪৮ সালে এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৪/১৯৫৭ সাল থেকে এখানে প্রথম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ মেলার সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে ত্রিবার্ষিক ধারায় নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ঋষিধামে অবস্থিত অদ্বৈতানন্দ সরোবর (ঠাকুরমারী দিঘি) ও দধিকুম্ভ দিঘি তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে পবিত্র বলে বিবেচিত। এখানে পবিত্র স্নানকে আত্মশুদ্ধি ও পুণ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মানা হয়।
এ ছাড়াও ঋষিধামে রয়েছে, ঋষিধাম সংস্কৃত কলেজ (প্রতিষ্ঠা: ১৯৬৯), অদ্বৈতানন্দ চ্যারিটেবল হাসপাতাল (প্রতিষ্ঠা: ২০১০), শ্রীগুরু মন্দির (পুনর্নির্মাণ: ২০১৭), এই প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি মানবসেবা ও সনাতন সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১১ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২২তম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা। বর্ণাঢ্য মহাশোভাযাত্রার মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
মেলার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সাধু সম্মেলন, হরিকথা ও ধর্মীয় আলোচনা, নামধ্বনি ও নামকীর্তন, ভক্তিমূলক সঙ্গীত ও পরিবেশনা, ভাণ্ডারা ও তীর্থসেবা।
এবারের মেলায় ভারতসহ দেশ-বিদেশ থেকে শতাধিক সন্ন্যাসী ও লক্ষাধিক ভক্ত-তীর্থযাত্রীর সমাগম ঘটেছে।
মেলার আয়োজন করছে ঋষি অদ্বৈতানন্দ পরিষদ-বাংলাদেশ, শ্রীগুরু সংঘের সার্বিক তত্ত্বাবধানে। প্রচার উপপরিষদের সদস্য সচিব নারায়ণ মল্লিক (নয়ন), পাশাপাশি সংগঠক ও কর্মীদের মধ্যে অসীম রায় (অশ্বিনী)সহ অনেকে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংগঠন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ঋষিধামের বর্তমান মোহন্ত শ্রীমৎ স্বামী সুদর্শনানন্দ পুরী মহারাজ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেহত্যাগ করেন। তাঁর পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের এই আসর পরিচালিত হচ্ছে শ্রীগুরু সংঘ ও উত্তরসূরি সন্ন্যাসীদের—যেমন শ্রীমৎ স্বামী সৎচিদানন্দ পুরী মহারাজ প্রমুখের—তত্ত্বাবধানে।
এর আগে ২১তম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ (২০২৩) সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা এই মেলার ধারাবাহিক সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে।
সামাজিক প্রভাব
ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতা, শান্তি, সহনশীলতা ও সামাজিক ঐক্যের বার্তা বহন করে। এখানে প্রচারিত হয় সনাতন ধর্মের মূল দর্শন—জীবাত্মা ও পরমাত্মার একাত্মতা। পাশাপাশি হতদরিদ্র ভক্তদের জন্য তীর্থসেবা, ভাণ্ডারা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা মানবিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
স্থানীয় প্রশাসন, ভক্তবৃন্দ, যুব সংগঠন ও গ্রামবাসীর সম্মিলিত সহযোগিতায় মেলাটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে চলমান রয়েছে।
বর্তমানে (২৭ জানুয়ারি ২০২৬) মেলার কার্যক্রম মধ্যপর্যায়ে রয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক ভক্তের উপস্থিতিতে ঋষিধাম পরিণত হয়েছে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার এক মহামিলনক্ষেত্রে।
সাংবাদিক অসীম রায় (অশ্বিনী) জানায়, ২২তম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা ঘুরে মনে হয়েছে—এটি কেবল ধর্মীয় আয়োজন নয়, মানবতার এক জীবন্ত মিলনক্ষেত্র। সাধু-সন্ন্যাসীদের ত্যাগ, ভক্তদের শান্ত উপস্থিতি ও নামকীর্তনের ধ্বনি ঋষিধামকে পরিণত করেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশে। নানা বয়স ও দেশের মানুষের সম্মিলন প্রমাণ করে, এই মেলা মানবিক ঐক্য ও সম্প্রীতির এক শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এই আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার পরিসর আরও বিস্তৃত হবে এবং বিশ্বব্যাপী সনাতন সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।







