চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করলে কানাডার সব পণ্যে ১০০% শুল্ক: ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবি: সিবিসি

কানাডা–চীন চুক্তি ঘিরে উত্তেজনা: চীনঘেঁষা বাণিজ্য ঠেকাতে কানাডার ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক চাপানোর ইঙ্গিত ট্রাম্পের।

টুইট প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা যদি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে কানাডার সব পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। ২৪ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

পোস্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ‘গভর্নর কার্নি’ বলে সম্বোধন করে ট্রাম্প বলেন, কানাডা যেন চীনের পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ‘ড্রপ অব পোর্ট’ না হয়।

ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “If Canada makes a deal with China, it will immediately be hit with a 100% Tariff against all Canadian goods and products coming into the U.S.A.” তিনি আরও বলেন, “China will eat Canada alive… If Governor Carney thinks he is going to make Canada a ‘Drop Off Port’ for China to send goods… he is sorely mistaken.” এই মন্তব্য উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।

ছবি: সংগৃহিত

কানাডা–চীন চুক্তি

এর আগে ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বে স্বাক্ষর করেন। এটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্ক ও বাজার-প্রবেশ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানকে কেন্দ্র করে করা সমঝোতা।

চুক্তির আওতায় চীনা ইলেকট্রিক যান (EV) কানাডায় সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার ইউনিট আমদানিতে ৬.১ শতাংশ MFN শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় কম। পাশাপাশি, কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য ক্যানোলা বীজে চীনের শুল্ক ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামানো হচ্ছে—যা ১ মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। ক্যানোলা মিল, লবস্টার, ক্র্যাব, মটরসহ আরও কয়েকটি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাটারি, সৌর ও বায়ু শক্তিসহ এনার্জি, ক্লিন টেক ও কৃষি–খাদ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডার রপ্তানি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

দাভোস সম্মেলন ও অবস্থান বদল

এর আগে ২০ জানুয়ারি ২০২৬-এ বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের দাভোস সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী কার্নি ‘রুলস-বেসড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’-এর অবসান ঘটছে বলে মন্তব্য করেন এবং মধ্যম শক্তিগুলোকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মহাশক্তিগুলোর শুল্ক ও অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেন—যদিও সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি। এই বক্তব্যের পরই ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হয়।

উল্লেখযোগ্যভাবে, চুক্তির পরপরই ট্রাম্প প্রথমে ইতিবাচক মন্তব্য করে বলেন, “It’s a good thing for him to sign a trade deal।” তবে দাভোস বক্তৃতার পর তার অবস্থান বদলে যায়। অতীতে ট্রাম্প কানাডাকে ‘৫১তম রাজ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং কার্নিকে ‘গভর্নর’ আখ্যা দিয়ে উপহাস করেছেন।

কানাডার প্রতিক্রিয়া

কানাডা সরকার জোর দিয়ে বলছে, এটি কোনো ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট নয়; কেবল নির্দিষ্ট শুল্কসংক্রান্ত জটিলতার সমাধান। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লে ব্ল্যাঙ্কসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা জানিয়েছেন, বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণ (diversification) কানাডার কৌশলের অংশ এবং তা অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি এক ভিডিও বার্তায় ‘Buy Canadian’ ও ‘Build Canadian’ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, “We can’t control what other nations do, we can be our own best customer.” প্রাদেশিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া এ বিষয়ে মিশ্র। এদিকে হোয়াইট হাউস বা কানাডা সরকারের দপ্তর থেকে নতুন করে তাৎক্ষণিক মন্তব্য আসেনি।

সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়িত হলে কানাডার অটো, মেটাল ও মেশিনারি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো–কানাডা চুক্তি (USMCA বা CUSMA) নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে—যা ট্রাম্প ইতোমধ্যে ‘irrelevant’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ পরিস্থিতি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়, বৈশ্বিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড ও ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যসহ এই শুল্ক হুমকি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

সূত্র: Reuters, The New York Times, CBC, BBC, NPR, CNBC, Al Jazeera, কানাডা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটসহ ২৪–২৫ জানুয়ারি ২০২৬-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন।