ব্যালটের আগে বাকযুদ্ধ চরমে: নির্বাচনী মঞ্চে মুখোমুখি বিএনপি–জামায়াত

ভোটের মাঠে তীব্র বাগযুদ্ধ: লক্ষ মানুষের স্রোতে বিএনপি এগিয়ে, আদর্শিক পাল্টা আঘাতে জামায়াত
বিশেষ প্রতিবেদন: আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংঘাত।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি ২০২৬) থেকে শুরু হওয়া প্রচারের প্রথম দুই দিনেই দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, অভিযোগ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ কার্যত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই নির্বাচনই প্রথম প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন, যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মধ্যে।
বিএনপির মাঠের দখল, জনসমাবেশে শক্তি প্রদর্শন
প্রচারের শুরুতেই বিএনপি জনসমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা প্রদর্শনে এগিয়ে যায়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার ভাষানটেকসহ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার—মোট আটটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এসব সমাবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে, যা জামায়াতের জনসমাবেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
বিশাল জনস্রোত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে সরাসরি জামায়াতের নাম না নিলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ সামনে আনেন। তিনি ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে ‘বেহেশতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে ‘শিরক’ ও ‘কুফরি’ হিসেবে আখ্যা দেন। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালট ছিনতাই, এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট চুরির আশঙ্কার কথা তুলে ধরে জনগণকে সতর্ক করেন।
বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, খাল খনন, কর্মসংস্থান ও বেকারদের প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন। বিদেশি আধিপত্য প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“দিল্লি নয়, পিন্ডিও নয়—সবার আগে বাংলাদেশ।” জনসভায় তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কৌশলও অনুসরণ করেন।
জামায়াতের আদর্শিক পাল্টা অবস্থান
এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকার মিরপুরসহ পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য দেন। উপস্থিতির দিক থেকে এসব সমাবেশ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও বক্তব্যে ছিল তীব্র আদর্শিক অবস্থান। তিনি নির্বাচনকে ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ব্যালটের মাধ্যমে সংগ্রামের কথা বলেন।
তারেক রহমানের বক্তব্যের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাফের বলতে পারে না এবং এটি গুরুতর অপরাধ। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও খুলনায় একইভাবে নির্বাচনকে ‘জিহাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে অতীত দুর্নীতি, নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ তোলা হয় এবং বিএনপিকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদী’ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তারা বিএনপিকে ‘দিল্লির আধিপত্যবাদ’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করে। বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগকে ‘খয়রাতি রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের কোনো কার্ড নেই—জনগণই তাদের শক্তি ও ভালোবাসার প্রতীক। জামায়াত নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে দেখছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ও সংঘাতের শঙ্কা
প্রচারের শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, ধর্মের ব্যবহার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, বিদেশি প্রভাব (পিন্ডি বনাম দিল্লি) এবং জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট—এই ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান স্পষ্টভাবে বিপরীতমুখী। এরই মধ্যে কিছু এলাকায় জামায়াতের নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, নিজেদের ভিন্নতা তুলে ধরতেই দলগুলো এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই বক্তব্যের লড়াই যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নির্বাচনের সময় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার বাংলাদেশের রাজনীতির পরিচিত চিত্র।
প্রচারের প্রথম দুই দিনের চিত্রে স্পষ্ট—আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী লড়াই এখন মূলত বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাঠের জনসমাবেশ ও জনসমর্থনে বিএনপি স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকলেও জামায়াত আদর্শিক ও ধর্মীয় ভাষ্য দিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
সামনের দিনগুলোতে এই বক্তব্যের সংঘর্ষ আরও তীব্র হতে পারে, তবে দেশের জনগণের প্রত্যাশা একটাই—সংঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।





