তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যা ও জ্ঞানের আরাধনায় মুখরিত সরস্বতী পূজা

পাহাড়ে বিদ্যা আর জ্ঞানের উৎসব। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন আয়োজন।
বান্দরবান প্রতিনিধি: হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা আজ মাঘ শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে।
জ্ঞান, বিদ্যা, সংগীত ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পাহাড়ের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। ঢাক-ঢোল, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে পুরো পাহাড়ি জনপদ আজ উৎসবের রঙে রাঙানো।
ধর্মীয় তাৎপর্য ও শাস্ত্রীয় বিধান
শাস্ত্রমতে, প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শ্বেতশুভ্র বসনে শোভিত কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবী সরস্বতীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবী সরস্বতীকে ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং শক্তির আধার হিসেবে আরাধনা করেন।
দেবীর এক হাতে বেদ ও অন্য হাতে বীণা—এ কারণে তাঁকে বীণাপাণি নামেও অভিহিত করা হয়। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সরস্বতী প্রতি বছর ভক্তদের মাঝে আবির্ভূত হয়ে চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেন এবং অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন।
পূজার সময় ভক্তরা মন্ত্রোচ্চারণে দেবীর আরাধনা করেন।
সর্বাধিক প্রচলিত মন্ত্রটি হলো—
“সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে,
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তুতে।”
বান্দরবান কেন্দ্রীয় মন্দিরে পূজার আয়োজন
বান্দরবান কেন্দ্রীয় মন্দিরে শুক্রবার সকালে বাণী অর্চনার মধ্য দিয়ে পূজা কার্যক্রম শুরু হয়। পুরোহিত শংকর চক্রবর্তীসহ অন্যান্য পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণে দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতি ও বর্ণাঢ্য আলোকসজ্জা।
কেন্দ্রীয় পূজা পরিষদের উদ্যোগে বিশেষ আয়োজন হিসেবে রয়েছে পিঠা উৎসব, শীতবস্ত্র বিতরণ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যারতি। মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল কান্তি দাশ জানান, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে পূজাকে আরও বর্ণিল ও অর্থবহ করে তোলা হয়েছে।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষে বান্দরবানের ৩০০ নং সংসদীয় আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাচিংপ্রু জেরী বলেন,
“বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার বছর ধরে এ দেশে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করে আসছেন। এ দেশ আমাদের সকলের। ধর্ম ও বর্ণভেদ নয়—বাংলাদেশ সকল মানুষের জন্য এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি।”
থানচির বলিপাড়ায় তিন দিনব্যাপী উৎসব
বান্দরবানের থানচি উপজেলার বলিপাড়ায় সনাতনী বাণী অর্চনা সংঘের উদ্যোগে ৭ম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা উদযাপিত হচ্ছে। বলিপাড়া বাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এ উৎসবে দ্বিতীয় দিনে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পূজাকর্ম অনুষ্ঠিত হয়।
পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জুয়েল দাশ ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ কর্মকারের নেতৃত্বে আয়োজিত এই উৎসবে সনাতনী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। আগামীকাল তৃতীয় ও শেষ দিনে সাঙ্গু নদীর ঘাটে দেবী প্রতিমার নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
অন্যান্য স্থানে পূজা
এছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব, বাসাবাড়ি ও পূজামণ্ডপে একই উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সরস্বতী পূজা উদযাপিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিশেষভাবে বাণী অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন।
সার্বিকভাবে পুরো পার্বত্য অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।






