বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা পাচার: গভর্নর

ছবি: সংগৃহিত

  • র্বৃত্তায়ন–পরিবারতন্ত্রে ধ্বংসের মুখে ব্যাংকিং খাত
  • ব্যাংকিং খাত থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
  • প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ৬১ ব্যাংক, কমিয়ে আনার প্রস্তাব
  • রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দুইটিতে নামিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনা
  • মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশে নামার আশাবাদ

টুইট প্রতিবেদক: দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র ও সুশাসনের অভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি জানান, এসব কারণেই ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ সম্ভবত বিদেশে পাচার হয়েছে।

পাশাপাশি পরিবারতন্ত্রের প্রভাবে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। আয়োজন করে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ।

ব্যাংকের সংখ্যা ও সুশাসনের প্রশ্ন

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় তিনি মনে করেন, দেশে ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট হতো। ব্যাংকের সংখ্যা কমানো গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে মাত্র দুটি রাখা এবং বাকি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করা। তার বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে প্রভাব না ফেলতে পারে; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক গভর্ন্যান্সের অভাবেই ব্যাংকিং খাত আজ ধ্বংসের মুখে—এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই খাতের প্রায় সব স্তরেই সংস্কার জরুরি।

খেলাপি ঋণ ও আইনগত সংস্কার

খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স (অধ্যাদেশ) জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারও ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাবে।

তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল ও টেকসই রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক রেজ্যুলিউশন ফান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ তহবিলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই রেজ্যুলিউশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

ক্যাশলেস সমাজ ও রাজস্ব আদায়

ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে গভর্নর বলেন, রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে নগদ লেনদেন। তার মতে, ক্যাশলেস ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে চালু করা গেলে বছরে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। এজন্য তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদদের মতামত

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, একটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বর্তমান গভর্নরের উদ্যোগ ও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে তা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। বিভিন্ন নীতি ও কাঠামোগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই খাত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং এই ইতিবাচক উন্নয়নধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটময় অবস্থার কথা এখন সবারই জানা। ঋণ খেলাপির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কমে গেছে, ফলে নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি বলে তিনি মত দেন।

আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহাবুব উল্লাহ, সমিতির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বক্তারা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।