ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’: জাতিসংঘের বিকল্প নাকি সমান্তরাল শক্তি?

ট্রাম্পের নেতৃত্বে নতুন শান্তি কাঠামো: গঠন, সদস্যপদ ও শর্ত। গাজা যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে ‘বোর্ড অফ পিস’-এর উত্থান।
টুইট প্রতিবেদক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ “বোর্ড অফ পিস” (Board of Peace) বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগ এখন বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানের একটি নতুন কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা অনেকের কাছে জাতিসংঘের (UN) সম্ভাব্য বিকল্প বা অন্তত সমান্তরাল শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই “বোর্ড অফ পিস”-এর ধারণা সামনে আসে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ২৮০৩-এর মাধ্যমে গাজার ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে—২০২৭ সাল পর্যন্ত—এই বোর্ডের ভূমিকা অনুমোদন পায়।
তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেন। ১৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড অফ পিস প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ট্রাম্প নিজেই এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বোর্ডটি এখন শুধু গাজা নয়, বিশ্বের যেকোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, পুনর্গঠন, স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।
বোর্ডের কাঠামো ও সদস্যপদ
বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্প নিজে। এক্সিকিউটিভ বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, স্টিভ উইটকফ, মার্ক রোয়ান এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট আজয় বাঙ্গাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
৬০টিরও বেশি দেশকে এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। স্থায়ী সদস্য হতে হলে ১ বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে, আর অস্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া হবে তিন বছরের জন্য। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলারুশ, মরক্কো ও হাঙ্গেরি ইতোমধ্যে যোগ দিয়েছে বা যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কানাডা বিশেষ শর্তে আলোচনায় আছে। ভারত, পাকিস্তানসহ আরও বহু দেশ আমন্ত্রণ পেয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান
২০ জানুয়ারি ২০২৬-এ হোয়াইট হাউস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, বোর্ড অফ পিস হয়তো জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, “জাতিসংঘকে চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এর সম্ভাবনা অনেক বড়।” ট্রাম্প দাবি করেন, গাজাসহ যেসব সংঘাত সমাধানে তিনি ভূমিকা রেখেছেন, সেগুলোতে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
বোর্ড অফ পিস নিয়ে বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি বাস্তববাদী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষম একটি কাঠামো, যা দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ এবং কুইন্সি ইনস্টিটিউটের মতো থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো একে ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাব আখ্যা দিয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের চার্টার, বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। কেউ কেউ একে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রিত ‘ট্রাম্প ইউনাইটেড নেশনস’ বলেও উল্লেখ করছেন।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, বোর্ড অফ পিস জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
দ্রুত পরিবর্তনশীল এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের দাভোস সফরের আগেই বোর্ড অফ পিসের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই নতুন কাঠামো শেষ পর্যন্ত সহযোগী নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে—সেটিই এখন বিশ্ববাসীর নজরকাড়া প্রশ্ন।







