বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে: স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া সম্ভব কি?

বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ে: ভাইরাল দাবি মিথ্যা, দ্বিতীয় বিয়েতে আইন অপরিবর্তিত, হাইকোর্ট রায় ভুলভাবে প্রচার।
টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে দ্বিতীয় বা পুনরায় বিয়ে একটি সংবেদনশীল বিষয়। ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনি—তিনটি দিক থেকেই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সংবাদ ও ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। ওই তথ্যে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের হাইকোর্ট মুসলিমদের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতির বাধ্যবাধকতা আর নেই—এমন একটি রায় দিয়েছেন। এই দাবিকে ঘিরে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে বিদ্যমান আইন, সংশ্লিষ্ট আদালতের রায় এবং আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনা ও বিতর্কের কারণ
২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি সংবাদ ও ফটোকার্ড ভাইরাল হয়। সেখানে বলা হয়, হাইকোর্টের এক রায়ে মুসলিম পুরুষদের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর লিখিত অনুমতি আর প্রয়োজন নেই। ফটোকার্ডে বিয়ে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার উল্লেখ থাকায় বিষয়টি আরও আলোচনার জন্ম দেয়।
এই দাবির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। এক পক্ষ একে নারী অধিকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন, অন্য পক্ষ ধর্মীয় স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে সমর্থনের চেষ্টা করেন। তবে দাবি সত্য কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিবিসি বাংলা আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করেছে যে, স্ত্রীর অনুমতির বিধান বাতিল করে এমন কোনো রায় হয়নি। বিদ্যমান আইন অপরিবর্তিত রয়েছে।
মুসলিম পারিবারিক আইন ও দ্বিতীয় বিয়ে
বাংলাদেশে মুসলিমদের বিয়ে, তালাক ও পুনর্বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ দ্বারা। এই আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো মুসলিম পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবশ্যই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি নিতে হয়।
এই কাউন্সিল বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মতামত ও সম্মতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং নারীদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এছাড়া, বাংলাদেশে সকল বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ১৯৬১ সাল থেকে কার্যকর এই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বহুবিবাহকে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের রায়: বাস্তবে কী ঘটেছে
২০২২ সালের জানুয়ারিতে একজন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। ওই রিটে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ৬–এর অধীনে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।
হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রিটটি শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট তা খারিজ করে দেন। এর ফলে আইনটির কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত ডিসেম্বর মাসে ওই রায়ের ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়, যা সাম্প্রতিক বিভ্রান্তির মূল উৎস হিসেবে আলোচনায় আসে।
তবে রায়ে কোথাও স্ত্রীর অনুমতির বিধান বাতিল করা হয়নি। বরং বিদ্যমান আইনি কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, “আবার বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি বা অনুমতি নেওয়ার যে নিয়ম ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তনই আসেনি।”
আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু নাসের মোঃ ওয়াহিদও জানিয়েছেন, রিট খারিজ হওয়ায় আগের নিয়মই কার্যকর রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সামাজিক প্রভাব
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় মুসলিম পারিবারিক আইনের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেছে এবং নারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয় বিয়ে এখনও সম্ভব, তবে তা অবশ্যই আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে।
আইনের ব্যত্যয় ঘটালে দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এই বিতর্ক নারী অধিকার বিষয়ক আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রচারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে মুসলিম পুরুষদের স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা আইনত সম্ভব নয়। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় এই বিধান বাতিল করেনি; বরং বিদ্যমান আইনই বহাল রেখেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো “স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ”—এমন দাবি বিভ্রান্তিকর ও ভুল ব্যাখ্যার ফল।






