গাছতলার তেঁতুল: পাহাড়ে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি

পাহাড়ের ‘রত্ন’ তেঁতুল: গাছতলার ফল থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সপ্তাহে ৫০-১০০ টন বিক্রি।
অসীম রায় (অশ্বিনী): একসময় গাছতলায় পড়ে থাকা, অবহেলিত তেঁতুল এখন তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি—র অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এই টক-মিষ্টি ফলের চাহিদা বেড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাঁও, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, নরসিংদী ও ময়মনসিংহে।
স্থানীয় হাট-বাজারে সপ্তাহে প্রায় ৫০-১০০ মেট্রিক টন তেঁতুল বেচাকেনা হয়, যা পাহাড়ের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের চিত্র ও ব্যবসা
পাহাড়ের বিভিন্ন হাট-বাজারে (যেমন চিম্বুক, ১৩ মাইল, কচ্ছপছড়ি, ১২ মাইল, বালাঘাটা, লেবুজড়ী) ভোর থেকেই স্থানীয়রা তেঁতুল নিয়ে আসেন। দুপুরের মধ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাত বদল করে তা চলে যায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের হাতে। বাজারে প্যাকেটিং করে খোসাসহ বা খোসাবিহীন কার্টনে ভর্তি করে পাঠানো হয়।
স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ১৫০-২০০ টাকা, সমতলে ১৮৯-২০০ টাকা বা তার বেশি।
ঢাকার মো. নুর নবী, হাসান আলী; নরসিংদীর আবুল হোসেন; চট্টগ্রামের জামাল উদ্দিনসহ অনেকে নিয়মিত আসেন।
চাহিদা: আচার তৈরির কারখানা, খাবারে ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কোনো কীটনাশক ব্যবহার না করায় গুণগত মান উচ্চ।
স্থানীয়রা বলছেন, আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, এখন আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যায়। চিম্বুকের হলাপ্রু মারমা, মিনু মারমা, লেবুজড়ীর মো. আব্দুল হাই, ছাইংগার আব্দুর রহমানসহ অনেকে তেঁতুল বিক্রি করে সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেছেন। বান্দরবানের বুলবুল আহমদ, অজিত দাশ, জিয়াবুল মিঞা, সুনুইপ্রু মারমার মতো বিক্রেতারা জানান, লোকসানের ভয় নেই।
কেন লাভজনক?
তেঁতুল গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে—কোনো পরিচর্যা, সার বা কীটনাশক লাগে না। একটি বড় গাছ থেকে বছরে কয়েকশ মণ ফল পাওয়া যায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, পাহাড়ের নদীর পাড়, উঁচু-নিচু এলাকায় অসংখ্য তেঁতুল গাছ রয়েছে। বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা ব্যাপক, এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠতে পারে।
তেঁতুলের স্বাস্থ্য উপকারিতা
তেঁতুল শুধু স্বাদের জন্য নয়, এর পুষ্টিগুণও অসাধারণ। এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন (বি১, বি২, সি), মিনারেল (ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম) রয়েছে। নিয়মিত খেলে শরীরে নিম্নলিখিত উপকার হতে পারে:
হজমশক্তি বাড়ায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ও ফাইবারের কারণে হজম সহজ হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
ওজন কমাতে সাহায্য করে: হাইড্রক্সিসাইট্রিক অ্যাসিড (HCA) ক্ষুধা কমায়, চর্বি জমা বাধা দেয় এবং মেটাবলিজম বাড়ায়।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী, গ্লুকোজ লেভেল কমায়।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়ায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
ইমিউনিটি বাড়ায়: ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যালার্জি প্রতিরোধ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
লিভার সুরক্ষা করে: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লিভারকে ফ্রি র্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করে।
অন্যান্য: অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণে আর্থ্রাইটিসে উপকার, ত্বক উজ্জ্বল করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
সতর্কতা: অতিরিক্ত খেলে দাঁতের এনামেল নষ্ট হতে পারে বা পিত্তপাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পাহাড়ের এই প্রাকৃতিক রত্ন এখন স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিচ্ছে। সরকারি সহায়তায় আরও বাণিজ্যিক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে। তেঁতুল—শুধু টক স্বাদ নয়, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক!






