ইরানে বিক্ষোভ: ফাঁসির হুমকিতে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

দমন–পীড়ন ভয়াবহ রূপ, আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত।
টুইট প্রতিবেদক: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দমন–পীড়ন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র “খুবই কঠোর ব্যবস্থা” নেবে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ হুঁশিয়ারি দেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, চলমান দমন–পীড়নে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,০০০ জনের বেশি প্রতিবাদকারী নিহত হয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিক্ষোভের বর্তমান পরিস্থিতি
অর্থনৈতিক সংকট, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সরকারি দুর্নীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই রেজিমবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। তেহরান, মাশহাদ, কোম, শিরাজ, কের্মানশাহসহ ২২টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ টানা ১০ দিনের বেশি সময় ধরে চলছে।
প্রতিবাদকারীরা “মৃত্যু খামেনেইকে” স্লোগান দিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীরা সংঘবদ্ধ ও অস্ত্রধারী হয়ে উঠছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী লাইভ ফায়ার, পেলেট গান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করছে। হামেদান, মারভদাশত ও কোমে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার
মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৭৩৪ জন নিহত, যার মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। তবে সংস্থাটি বলছে, তথ্য সীমিত হওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যান্য সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২,৪০০-এর বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষও পরোক্ষভাবে ব্যাপক প্রাণহানির কথা স্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি থাকায় প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ
কারাজ শহরের ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানিসহ কয়েকজন প্রতিবাদকারীর বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ (ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ) অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যেকোনো সময় এসব ফাঁসি কার্যকর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর ডজনখানেক সদস্য নিহত হয়েছেন এবং তাদের জানাজা সরকারপন্থী সমাবেশে রূপ নিয়েছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, “সাহায্য আসছে” এবং “প্রতিবাদ চালিয়ে যান”। তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল–এ লেখেন, প্রতিবাদকারীদের ওপর ‘অর্থহীন হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “যদি তারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে এবং ফাঁসি কার্যকর শুরু করে, তাহলে পরিণতি কী হয়, তা তারা দেখবে।”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”, প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে ফারসিতে একটি বার্তাও প্রকাশ করা হয়, “আমি একজন অ্যাকশনের মানুষ। যদি না জানেন, এখন জানুন।”
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে গোপন সামরিক বিকল্প নিয়েও ব্রিফ করা হয়েছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারিকে ‘সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই প্রতিবাদকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ উল্লেখ করে বলেন, “আমরা শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসাব।”
তেহরান দাবি করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিদেশি শক্তির উসকানিই এই অস্থিরতার মূল কারণ। জাতিসংঘে ইরানের মিশন একে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরির চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন প্রাণহানিকে ‘ভয়াবহ’ বলে আখ্যা দিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন।
জাতিসংঘ ইরানকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, “কিছু বড় ঘটনা ঘটতে চলেছে।” সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট লিখেছেন, “সময় এসে গেছে।”
১৪ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ইলাম প্রদেশের মালেকশাহিতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে একাধিক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলো রক্তের সংকটে ভুগছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ–রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।






