মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: কেন ঘটছে এমন ঘটনা?

কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) রাত আনুমানিক সোয়া ৯টার দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিত্যক্ত মালামাল সংরক্ষণের স্থানে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষজন উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতের আঁধার ভেদ করে আগুনের লেলিহান শিখা বহু দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিল। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। তবে বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা হওয়ায় সেখানে কড়াকড়ি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় সাধারণ মানুষ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে আগুনের প্রকৃত অবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হতে পারেননি।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে আগুন লেগেছে। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করেছে বলে তিনি জানান।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাতারবাড়ী ইউনিটের টিম লিডার সালাহ উদ্দিন জানান, স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডটি মাতারবাড়ী টাউনশিপ এলাকার একটি খোলা জায়গায় অবস্থিত। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত কাঠ, টিন, লোহার রড, ধাতব কাঠামোসহ বিভিন্ন ধরনের পরিত্যক্ত ও দাহ্য মালামাল দীর্ঘদিন ধরে স্তূপ করে রাখা ছিল। এসব মালামালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়।

ঘটনার পরপরই মহেশখালী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, প্রায় ১০ জন কর্মী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। আগুনের ব্যাপকতা বিবেচনায় পরে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। একাধিক ইউনিটের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাত পৌনে ১১টা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ওই সময় পর্যন্ত আগুন নেভানোর কার্যক্রম চলমান ছিল বলে ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের স্থানটি মূল ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র অবকাঠামো তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন যদি আরও ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এখন পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে থাকা পরিত্যক্ত মালামালের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার পর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে স্থানীয়দের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের অন্যতম বড় ও কৌশলগত বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় কীভাবে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটল এবং সেখানে অগ্নি নিরাপত্তা ও স্ক্র্যাপ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা মাতারবাড়ী প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে মনে করছেন।