মনোনয়ন বাতিল-স্থগিতে শেরপুরে পাল্টে গেল ভোটের সমীকরণ

শেরপুরের তিন আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই: বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা স্থগিত, বদলাচ্ছে ভোটের সমীকরণ।
টুইট প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেরপুর জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
তিন আসনে মোট ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাই শেষে ছয়জনের মনোনয়নপত্র বাতিল এবং একজন বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা স্থগিত রাখা হয়েছে। এতে করে বিএনপি, স্বতন্ত্র, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দিনব্যাপী যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাতিল ও স্থগিতের কারণ হিসেবে ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যাবে আগামী ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি এবং এরপরই প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা।
শেরপুর-১ (সদর) আসন
শেরপুর সদর আসনে সাতজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাইয়ে জাতীয় পার্টির মাহমুদুল হক (মনি), মো. ইলিয়াস উদ্দিন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সফিকুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।
বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সানসিলা জেবরিন। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন শফিকুল ইসলাম (মাসুদ)। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মো. রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ) এবং এনসিপির লিখন মিয়ার মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সানসিলা জেবরিন বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন এবং ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম জানান, তৃণমূলের সমর্থন ও উৎসাহেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির ভেতরে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
শেরপুর-২ (নকলা–নালিতাবাড়ী) আসন
এই আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতার কারণে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল না করায় রিটার্নিং কর্মকর্তা তার প্রার্থিতা স্থগিত রাখেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ইলিয়াস খান এবং জাতীয় পার্টির রফিকুল ইসলাম (বেলাল)-এর মনোনয়নপত্র ঋণখেলাপির অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে।
বর্তমানে এ আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মু. গোলাম কিবরিয়া এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ আল কায়েস। গোলাম কিবরিয়া জানান, জোটগত সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত না হলেও প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ফাহিম চৌধুরী বলেন, তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করবেন এবং প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে না পেলে এ আসনে একজন প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসন
শেরপুর-৩ আসনে তুলনামূলক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এখানে চারজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বৈধ প্রার্থীরা হলেন—বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক (রুবেল), স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম (বাদশা), জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মু. নুরুজ্জামান (বাদল) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবু তালেব মো. সাইফুদ্দিন।
মাহমুদুল হক বলেন, দলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারণায় নেমেছেন এবং ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিনুল ইসলাম জানান, তৃণমূলের সমর্থন নিয়েই তিনি নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন এবং জনগণের বিশ্বাসের ওপর ভর করেই লড়াই চালিয়ে যাবেন।
নতুন ও পরিচিত মুখের সমন্বয়ে এই আসনে ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সার্বিকভাবে, শেরপুর জেলায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মনোনয়ন বাতিল ও প্রার্থিতা স্থগিতের ঘটনায় নির্বাচনী পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ এবং ৭২৩ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষে এই চিত্রে আরও পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।






