বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় সংস্কার: রিস্ক বেইজড সুপারভিশন

ব্যাংক খাতে কঠোর নজরদারির নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা শুরু।

ব‌দিউল আলম লিংকন: বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতে তদারকি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন (রিস্ক বেইজড সুপারভিশন বা আরবিএস) কাঠামো চালু করেছে। প্রথাগত সমান নজরদারির পরিবর্তে এখন থেকে প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মূল্যায়ন করে তদারকির গভীরতা ও ধরন নির্ধারণ করা হবে।

এ ব্যবস্থা গতকাল রবিবার (৪ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

নতুন এই কাঠামোর আওতায় ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা তথ্য ও ডেটা বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিক-নির্দেশনা প্রদান করবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। এতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কঠোর ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: কর্মকর্তা শাস্তি, এমডি অপসারণ, পর্ষদ ভেঙে দেওয়া বা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি-সংক্রান্ত বিভাগগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে। পূর্বের ১৩টি বিভাগের পরিবর্তে এখন ১৭টি বিভাগ গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ‘ব্যাংক সুপারভিশন’ বিভাগে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংককে আলাদা গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। বাকি পাঁচটি বিভাগ হলো: কারিগরি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং তদারকি, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, তদারকি নীতি প্রণয়ন, পেমেন্ট সিস্টেম সুপারভিশন এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ। মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত নতুন বিভাগটি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর আদলে কাজ করবে।

যদিও এ ব্যবস্থা ১ জানুয়ারি থেকে চালুর কথা ছিল, কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির ফলে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তাদের শাস্তি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এমনকি ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ।

বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে প্রস্তুতি নেওয়ার পর পাইলট প্রকল্পে ২০টি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এখন সব তফসিলি ব্যাংক এর আওতায় আসবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বাড়বে এবং খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন ঝুঁকি কমবে।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (RBS)

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকিতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (Risk-Based Supervision – RBS) কাঠামো চালু করেছে।

প্রথাগত রুটিন পরিদর্শনের পরিবর্তে এখন প্রতিটি ব্যাংকের ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করে তদারকির ধরন ও গভীরতা নির্ধারণ করা হবে।

এটি একটি ভবিষ্যৎমুখী, ডেটা-চালিত ও ক্রমাগত প্রক্রিয়া, যাতে অফ-সাইট মনিটরিং এবং লক্ষ্যভিত্তিক অন-সাইট পরিদর্শনের সমন্বয় থাকে।

মূল্যায়ন করা হয় ক্রেডিট, মার্কেট, অপারেশনাল, মানি লন্ডারিং, সাইবার ও জলবায়ুসহ বিভিন্ন ঝুঁকি।
প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপ: ঝুঁকি মূল্যায়ন → পরিকল্পনা → নিয়মিত যোগাযোগ → প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ → ফলো-আপ।
ঝুঁকি বেশি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—যেমন কর্মকর্তা শাস্তি, এমডি অপসারণ বা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া।
এজন্য তদারকি বিভাগ ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ১৭টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি ব্যাংক-নির্দিষ্ট এবং ৫টি বিশেষায়িত (ডিজিটাল ব্যাংকিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ML/TF প্রতিরোধ ইত্যাদি)।

এই পদ্ধতি আর্থিক সংকট আগে শনাক্ত করে প্রতিরোধ করবে, খাতে শৃঙ্খলা বাড়াবে এবং জমাকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

এই পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।