পাহাড়ি জীবনে ভরসা জুম চাষ

বিতর্ক থাকলেও জুম আজও পাহাড়িদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অসীম রায় (অশ্বিনী): পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ভাঁজে সবুজের সমারোহ, কোথাও ধানের গালিচা, কোথাও কুমড়ালতা আর এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভুট্টার সারি—এই দৃশ্যই তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি জীবনের অনন্য প্রতিচ্ছবি। এ জনপদে পাহাড়িদের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে জুম চাষ।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক

জুম চাষ শুধু কৃষি নয়, বরং পাহাড়ি জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক জীবনধারা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বাপ-দাদার পেশা হিসেবে জুমকে আঁকড়ে বেঁচে আছে। একই জমিতে ধান, কাঁউন, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, তিলসহ নানা শস্য একসঙ্গে ফলানো জুম চাষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

সরেজমিন অভিজ্ঞতা

শুক্রবার সকালে বান্দরবানের বাগিছড়া, কোহালং, আমজাদী পাড়া, রাজবিলা, উদালবুনিয়া, চিবুক, গোলিয়াখোলা ও অযোদ্ধা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মূল সড়ক থেকে কখনো ২৫ মিনিট গাড়ি ভ্রমণ আবার কোথাও ৩০ মিনিট হাঁটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছানো যায় জুম খেতের কাছে।

টিলা বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে শরীরের সমস্ত শক্তি ক্ষয় হয়ে এলেও চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়। সবুজ পাহাড়, টিলার গা বেয়ে নেমে আসা বাতাস, আর টিলার চূড়ায় পৌঁছে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন জুম খেত। ছন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট দুটি ঝুপড়ি যেন ক্লান্ত পথিক বা চাষিদের বিশ্রামের ঠিকানা।

কৃষকের কথা

স্থানীয় কৃষক সুনি ত্রিপুরা বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই বাবাদের সঙ্গে জুম করে আসছি। একই জমিতে ধান, মরিচ, কুমড়া, মারফা সহ নানা ফসল হয়। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রি করে আয়ও হয়।”

আকবর হোসেন নামে আরেক কৃষক জানান, “আমি তিন বিঘা জমিতে জুম করি। আমাদের জমি তেমন নেই, তাই জুম ছাড়া উপায় নেই। কৃষি অফিস থেকে কিছু সহায়তার কথা শুনেছি, কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। উন্নত বীজ, সার আর বাজার সুবিধা পেলে আমরাও আধুনিক কৃষির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারব।”

অগ্য মারমা বলেন, “জুম চাষ যদিও শ্রমসাধ্য, তবুও এটাই আমাদের একমাত্র ভরসা। যদি আধুনিক সরঞ্জাম আর ঋণ সুবিধা পাওয়া যায়, তাহলে আরও ভালো ফসল উৎপাদন সম্ভব।”

সংস্কৃতি ও উৎসব

জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। জমি প্রস্তুত থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দলবদ্ধ শ্রম, গান, নৃত্য আর উৎসবের আমেজ থাকে। নতুন ধানের ভাত রান্না করে আত্মীয়-স্বজনকে নিমন্ত্রণ করার নবান্ন উৎসব জুমের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি বড় ঐতিহ্য।

বিতর্ক ও পরিবেশগত উদ্বেগ

পরিবেশবিদদের মতে, লাগাতার জুম চাষে বন উজাড় হচ্ছে, পাহাড়ের মাটির উর্বরতা কমছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো পরিবেশ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, চাষিরা বলেন জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য জুমই ভরসা। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা প্রাচীন এই কৃষি পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি উদ্যোগ

বান্দরবান কৃষি কর্মকর্তা জানান, “জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি হলেও পরিবেশ ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। তাই আমরা কৃষকদের টেকসই জুম চাষে উৎসাহিত করছি এবং বিকল্প আয়ের উৎস যেমন ফলজ বাগান, সবজি চাষে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পেলে জুম চাষীরা স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।”

সব বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জুম কেবল কৃষি নয়; এটি পাহাড়ি সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। আধুনিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তি ধীরে ধীরে জুম চাষকে প্রান্তিক করলেও পাহাড়ি জীবনে আজও এর প্রাণস্পন্দন অটুট।