পার্বত্যবাসীর প্রশ্ন—বান্দরবান কি অপরাধীদের ডাম্পিং জোন?
‘ওভারনাইট বান্দরবানে পাঠিয়ে দেব’—শাস্তি নাকি অবজ্ঞা?
পার্বত্য জেলাগুলো কি হচ্ছে অপরাধীদের নির্বাসনকেন্দ্র?
বান্দরবান থেকে অসীম রায় (অশ্বিনী): ‘ওভারনাইট বান্দরবানে পাঠিয়ে দেব’—একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনের এই সংলাপ ২০২১ সালে জাতীয় পর্যায়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
পার্বত্য অঞ্চলকে অবজ্ঞার চোখে উপস্থাপন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তা বন্ধ করেছিল সংসদীয় কমিটি। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—সত্যিই কি বদলেছে দৃষ্টিভঙ্গি?
সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার এক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠলে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে বদলি করা হয় বান্দরবানে। এর প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে স্থানীয়রা। সামাজিক সংগঠন ও সচেতন শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—বান্দরবান কি অপরাধীদের ডাম্পিং জোন?
পাহাড় মানেই শাস্তি?
জনমনে বহুদিন ধরেই একটি ধারণা গেঁথে গেছে—“যদি শাস্তি পেতে হয়, তবে পাঠানো হবে পাহাড়ে।”
শুধু এই ঘটনাই নয়, দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ‘নির্বাসনের’ গন্তব্য হিসেবে পাঠানোর নজির আছে। যেন এটি অপরাধীদের দমন নয়, স্থানান্তর মাত্র।
একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “চর ও পাহাড় এলাকায় বসবাস, যোগাযোগ, সেবা গ্রহণ—সবই কঠিন। তাই সেখানে পরিবার নিয়ে থাকা অনেকের জন্যই কঠিন ও অস্বস্তিকর। এই বাস্তবতা থেকেই অনেকেই পার্বত্য জেলাকে ‘শাস্তির স্থান’ হিসেবে বিবেচনা করে।”
প্রশাসনিক বদলির নামে অপমান!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদা পারভীন বলেন,
“যে ব্যক্তি অনৈতিক আচরণ করে, তাকে বান্দরবানে বদলি দেওয়া হলে বার্তাটি হয়—এই জায়গায় পাঠানো মানে তাকে হেয় করা। এতে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পাহাড় একপ্রকার নির্বাসনের স্থান হয়ে ওঠে, যা অপ্রত্যাশিত।”
ভাতা আছে, মনোভাব নেই!
সরকার দুর্গম অঞ্চল, পাহাড়, চর বা হাওরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করেছে। কোথাও ৩ হাজার, কোথাও ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হয়। তবুও পাহাড় মানেই ‘শাস্তি’—এই মনোভাব এখনও কাটেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রশ্ন: “আমরাও কি অপরাধী?”
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, “শুধু চাকরির জায়গা নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির এলাকা। এখানে দক্ষ, সৎ ও সংবেদনশীল কর্মকর্তার প্রয়োজন। কিন্তু বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের এখানে বদলি করে যেন ২০ লাখ পার্বত্যবাসীর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করা হচ্ছে।”
সমিতির সভাপতি এ এইচ এম ফারুক, সিনিয়র সহসভাপতি মিতায়ন চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন ভূঁইয়ার ভাষায়,
“এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় জনগণ কঠোর কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবে। বদলির নামে অপমান আর বরদাশত করা হবে না।”
পার্বত্য অঞ্চল মানেই দুর্গমতা, বিচ্ছিন্নতা ও সীমাবদ্ধতা—এই চিরাচরিত ধ্যানধারণা ভেঙে দিতে রাষ্ট্রের আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এখানে কাজ করতে আসা কর্মকর্তাদের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই অঞ্চলের প্রতি মনোভাব বদলাবে না।