বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি: অর্থনীতি কি সংকটে?

বদিউল আলম লিংকন : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের ২০.২ শতাংশ।

আগের বছরের তুলনায় এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ঋণ প্রবৃদ্ধি দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃতফসিলের নীতির কারণে খেলাপিরা আরও সুবিধা পাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যে অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে, নিয়মনীতি স‌ঠিক প‌রিপালনের কারণে এখন তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। এর ফলে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের ২০ দশ‌মিক ২ শতাংশ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি: কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, “আমরা আগেই অনুমান করেছিলাম যে খেলাপি ঋণ বাড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এটি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা বর্তমানে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ পুনঃতফসিলের শিথিল নীতিই মূলত খেলাপি ঋণ বাড়ানোর প্রধান কারণ।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু নির্দিষ্ট কারণের জন্য দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ছে-

ঋণ পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার – বারবার সময় বাড়িয়ে খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকের দুর্বল তদারকি – ঋণ আদায়ের যথাযথ ব্যবস্থা নেই।

রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা – কিছু ব্যবসায়ী বারবার ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছেন।

অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি – ব্যবসা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে।

সমাধান কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।

ঋণ আদায়ের জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় খেলাপিদের দায়বদ্ধ করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ কী বলছে?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে।