তারাগঞ্জে ১৫ পয়েন্টে বালু উত্তোলন, ঝুঁকিতে ৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প

যমুনেশ্বরী ও চিকলী নদীতে ড্রেজার-ভেকুর দাপট; হুমকিতে গুচ্ছগ্রাম, সেতু, বসতভিটা ও কৃষিজমি

নিজস্ব প্রতিবেদক, তারাগঞ্জ (রংপুর): রংপুরের তারাগঞ্জে যমুনেশ্বরী ও চিকলী নদীর বিভিন্ন স্থানে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার অন্তত ১৫টি পয়েন্টে ড্রেজার ও ভেকু মেশিন দিয়ে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সেচ প্রকল্প, একটি গুচ্ছগ্রাম, দুটি সেতু, নদীতীরবর্তী বসতভিটা ও কৃষিজমি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি উপজেলার খোলাইঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চিকলী নদী থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলনস্থলের কাছেই রয়েছে একটি গুচ্ছগ্রাম, বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর নির্মিত দুটি সেতু এবং প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেচ প্রকল্প।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়ায় বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীতীরবর্তী বসতভিটা ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেচ প্রকল্পটি এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে এ প্রকল্পের পানি দিয়ে তারাগঞ্জসহ আশপাশের তিন উপজেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন চলতে থাকায় প্রকল্পটির স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আকালিমা, মোতাহার ও হাবিবুর রহমান বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু এরপরও বালু তোলা বন্ধ হয়নি। তাঁদের আশঙ্কা, নদীর পাড় ভেঙে গেলে গুচ্ছগ্রামটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ধোলাইঘাটের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, নদীর পাড়ে তাঁর কয়েকটি আম ও কাঁঠালগাছ ছিল। বালু উত্তোলনের কারণে পাড় ধসে গাছগুলো নদীতে চলে গেছে। এখন আবার ভেকু দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এতে তাঁর কৃষিজমিও হুমকির মুখে পড়েছে।

খোলাইঘাট বাজারের ব্যবসায়ী মহসিন, আকবর আলী ও ভ্যানচালক খাদিমুল হক বলেন, আগেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদী থেকে বালু তুলেছেন। বর্তমানে আবারও প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চলছে। তাঁরা দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খোলাইঘাট ছাড়াও কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুরের চাকলা, হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী, নেকিরহাট, খারুভাজ, উজিয়াল, সয়ার, ঠাকুরটারি ও মুচিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় যমুনেশ্বরী নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এসব স্থানে দিন-রাত দুই সময়েই বালু তোলা হচ্ছে।

উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের আবু বক্কর বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে সেতু, গুচ্ছগ্রাম ও সেচ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমাউল হুসনা বলেন, বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন।

তিনি বলেন, বালু উত্তোলনকারীরা গভীর রাতে, দুর্গম স্থানে এবং অনেক সময় পার্শ্ববর্তী উপজেলার সীমানায় গিয়ে বালু তোলেন। যেহেতু এটি আমলযোগ্য অপরাধ, তাই স্থানীয় প্রশাসন, গ্রাম পুলিশ, ইউপি সদস্য, পুলিশ ও সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। প্রয়োজনে মামলা দায়ের করতে হবে।