শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার ছক, অর্থায়নে তিন নেতা: পুলিশের দাবি

মিছিল থেকে অগ্নিসংযোগ, কাজভেদে মিলত ১০ হাজার টাকা, পুলিশের দাবি; দুই দিনে গ্রেপ্তার ৫০।

টুইট প্রতিবেদক: তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে নাশকতার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, আওয়ামী লীগ নেতা এসএম মান্নান কচি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম অর্থায়ন ও নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় তাদের হয়ে লোক সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল। শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া, মিছিল করা, টায়ারে আগুন দেওয়া এবং গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য পৃথক অঙ্কের অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে দাবি পুলিশের।

গত রোববার মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মুঠোফোন যাচাই করে এসব তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে অভিযুক্ত নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কাজভেদে ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মিছিলে অংশ নিলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, টায়ারে আগুন দিলে ৩ হাজার টাকা এবং গাড়ি বা স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করলে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

কাজের প্রমাণ হিসেবে ছবি ও ভিডিও পাঠানোর শর্ত ছিল। কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তি মুঠোফোনের আর্থিক লেনদেনসেবার মাধ্যমে টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি করেছে ডিবি।

তদন্তে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনে বিভিন্ন নামে ২০ থেকে ২৫টি অনলাইন দলের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব দলে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের অবস্থান, কার্যক্রম, ছবি ও ভিডিও পাঠাতেন।

মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভিযোগ আলিফ-জুয়েলের বিরুদ্ধে

পুলিশের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত তিন নেতা বিভিন্ন অনলাইন দলের মাধ্যমে নির্দেশনা দিতেন। ঢাকায় লোকবল সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ করতেন আলিফ মোল্লাহ ও মাহবুবুর রহমান জুয়েল।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জুয়েল দীর্ঘদিন জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শুভ এবং মিরপুরের রূপনগর আওয়ামী লীগের সদস্য কামাল গাজীর নামও তদন্তে এসেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির মিরপুর বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার উদ্দেশ্যে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জনকে সংগঠিত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের গাড়িতে আগুনের ঘটনায় আলিফের নির্দেশনার অভিযোগ

পুলিশের দাবি, গত রোববার মিরপুর ১০ নম্বরে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় অনলাইন দলে বার্তা পাঠিয়ে নেতাকর্মীদের মিরপুর ২ নম্বরের লাভ রোডে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন আলিফ মোল্লাহ। পরে তাদের মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে পাঠানো হয়।

সেখানে পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে ওই ঘটনার ছবি ও ভিডিও আলিফের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তাকে গ্রেপ্তারে একাধিক স্থানে অভিযান চালানো হলেও এখনো পাওয়া যায়নি।

এদিকে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার রাতে রাজধানীর উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরে তাকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

দুই দিনে গ্রেপ্তার ৫০

মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তিন থানায় চারটি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলায় অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

মামলাগুলোতে দুই দিনে থানা পুলিশ ও ডিবি অন্তত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত রোববার গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ জনকে সোমবার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে একই দাবিতে সোমবার তৃতীয় দিনের মতো মিরপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন পোশাকশ্রমিকেরা। তবে পুলিশের বাধায় তারা সড়কে অবস্থান নিতে পারেননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, পুরো ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নাশকতায় জড়িতদের ছাড় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

সোমবার সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, কিছু পক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়কে আগুন জ্বালানো ও অবরোধের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। অডিও-ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।