শেরেবাংলা নগরে যাচ্ছে সচিবালয়, মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন

৩১.৫৮ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা; সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ, মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন ও রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবেও অনুমোদন।

টুইট ডেস্ক: ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বর্তমান সচিবালয়ের জায়গা ও ভবনসংকট, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশের অভাব বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩১.৫৮ একর জমিতে নতুন সচিবালয়

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নতুন সচিবালয় নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব ভবনে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের যানবাহন রাখার জন্য মোট ৩ হাজার ৮০০টি পার্কিংয়ের জায়গা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি হবে ভূ-উপরিস্থ পার্কিং।

নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্সে একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি বহুমুখী হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি ডাকঘর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান সচিবালয়ে জায়গা ও নিরাপত্তার সংকট

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত প্রস্তাবে বর্তমান সচিবালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গার ওপর সচিবালয়ের ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবন ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ভূমিকম্পপ্রবণ ঢাকা শহরে এসব ভবনে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যমান ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত অফিস স্পেস ও ওয়াশ-ব্লকের অভাব রয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং সচিবালয় কমপ্লেক্সের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে একই জায়গায় আনার জন্য আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাবে মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে নীতিগত অনুমোদনের অর্থ নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাওয়া নয়; পরবর্তী প্রশাসনিক, কারিগরি ও প্রকল্প-অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক’ থেকে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত এ প্রস্তাবের ফলে নাম পরিবর্তনের পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নাম কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, সরকারি ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় মন্ত্রিসভা নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। তবে অধ্যাদেশটি কার্যকর করার আগে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।

সরকারের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এর আওতায় আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ইতোমধ্যে প্রণোদনা ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক বা ওপেক্স মডেল অনুসরণ করা যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রয়েছে, তারা ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনায় মূলধনি ব্যয়ভিত্তিক বা ক্যাপেক্স মডেলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে।

ওপেক্স মডেলে সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণ, ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিদ্যুতের অংশ প্রদান এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের ঘাটতি রয়েছে। এ মডেলে চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ এবং বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট বিধানের অভাবের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্পষ্ট বিধিবিধান তৈরির লক্ষ্যেই বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।

রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা জোরদারে রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়।

কনভেনশনটির পূর্ণ নাম ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তথ্য বিনিময়, আমদানিকারক দেশের পূর্বসম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা।
১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত কনভেনশনটি ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতোমধ্যে ১৬৭টি দেশ এতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্যদেশগুলো কনভেনশনটি অনুমোদন করেছে বা এতে যোগ দিয়েছে।

কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত হলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি রাসায়নিকের তথ্যভান্ডার তৈরি, আমদানি-রপ্তানির গতিবিধি অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।

কনভেনশনের সংযুক্তি-৩-এ তালিকাভুক্ত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ অংশ নিতে পারবে। এর ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং দায়িত্বশীল বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে।

কনভেনশনের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আইনি তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কনভেনশন সচিবালয় ও অন্যান্য সদস্যদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা গ্রহণের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এক বৈঠকে চার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে গৃহীত চারটি প্রস্তাবের মধ্যে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ প্রশাসনিক অবকাঠামো ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি প্রশাসনিক পরিচিতির পরিবর্তন আনবে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশের লক্ষ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিনিয়োগের কাঠামো নির্দিষ্ট করা। অন্যদিকে, রটারডাম কনভেনশনে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ বিপজ্জনক রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, বিধিবিধান প্রণয়ন এবং পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর। বিশেষ করে নতুন সচিবালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয়, অর্থায়ন, নির্মাণের সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।