বদলি ঠেকাতে আবেদনে, বেরিয়ে এলো বয়সের গরমিল

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালেই ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছিল মাধব কুমার দাশের; এরপরও তিন বছরের বেশি সময় চাকরিতে বহাল থাকার ঘটনায় উঠেছে প্রশ্ন?
টুইট প্রতিবেদক: যমুনা অয়েল পিএলসির সদ্য অবসরে যাওয়া কর্মচারী মাধব কুমার দাশের চাকরিতে যোগদানের সময় বয়স কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত অবসরের বয়স পার হওয়ার পরও তিনি তিন বছরের বেশি সময় চাকরিতে বহাল ছিলেন। সম্প্রতি বদলির আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করার পর তাঁর বয়সসংক্রান্ত অসংগতি সামনে আসে। পরে শারীরিক অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
মাধব কুমার সর্বশেষ খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে কর্মরত ছিলেন। গত ১১ জুন তাঁকে ওই ডিপো থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে বদলি করা হয়। বদলির আদেশ স্থগিতের আবেদন করতে গিয়ে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা জানান। এর পরই তাঁর বয়সসংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জন্মতারিখ নিয়ে নথিতে অসংগতি
কোম্পানির নথি অনুযায়ী, মাধব কুমার দাশ ১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চাকরিতে যোগ দেন। সে সময় তাঁর জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৬৩ সালের ৩ জানুয়ারি।
জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখ সঠিক হলে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতেই তাঁর বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয়। এরপরও তিনি চাকরিতে বহাল ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অবসরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চিকিৎসকের প্রতিবেদনে শারীরিক অক্ষমতার তথ্য
কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরীর স্বাক্ষর করা ৬ সেপ্টেম্বরের আদেশে বলা হয়, গত ১৪ জুন বদলির আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন মাধব। আবেদনে তিনি পরপর চারবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না বলেও উল্লেখ করেন।
এরপর ১৮ জুন দৌলতপুর ডিপোর খণ্ডকালীন চিকিৎসা কর্মকর্তা তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রত্যয়নপত্র দেন। এতে মাধবকে আংশিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এবং হাঁটাচলায় সম্পূর্ণ অক্ষম বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর অক্ষমতার কথাও জানানো হয়।পরবর্তী সময়ে ২২ আগস্ট যমুনা অয়েলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা দৌলতপুর ডিপো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাধব চলাফেরা, ভারসাম্য রক্ষা, শারীরিক সমন্বয় এবং স্পষ্টভাবে কথা বলার সক্ষমতা হারিয়েছেন। ভবিষ্যতে আবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় চিকিৎসার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শ্রম আইনের ধারায় অব্যাহতি
প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মাধব কুমার দাশকে চাকরি করার জন্য শারীরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। পরে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২২(১) ধারা উল্লেখ করে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কোম্পানির আদেশে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত ১৮ জুন থেকে কার্যকর দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্য তাঁকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত যমুনা ভবনে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
চিকিৎসাপত্রেও বয়স ৬৫ বছর
মাধবের অসুস্থতার বিষয়ে কোম্পানিতে জমা দেওয়া চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রেও তাঁর বয়স ৬৫ বছর উল্লেখ রয়েছে। গত ২ এপ্রিল খুলনা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক পলাশ তরফদারের ব্যবস্থাপত্রে এই বয়স লেখা হয়। একই বয়স উল্লেখ করা হয় ১১ মে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিশ্বজিৎ মণ্ডল শোভনের ব্যবস্থাপত্রেও।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখ অনুযায়ী অবসরের বয়স পূর্ণ হওয়ার পরও কীভাবে মাধব চাকরিতে বহাল ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর অবসরের বিষয়ে দীর্ঘদিন ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
কী বলছেন মাধব ও কোম্পানির কর্মকর্তা
বয়সের অসংগতি সম্পর্কে ঢাকা পোস্টকে মাধব কুমার দাশ বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বয়স হালনাগাদ করা হয়নি। এটি ভুল ছিল এবং পরে সংশোধনও করা হয়নি। এ কারণে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, দৌলতপুর ডিপোর উপব্যবস্থাপক আবুল ফজল মো. সাদেকিন বলেন, তিনি যোগদানের আগের ঘটনা হওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না।
বয়সসংক্রান্ত অসংগতির বিষয়টি সামনে আসার পর চাকরিতে বহাল থাকা, অবসরের ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এ ঘটনায় বয়সসংক্রান্ত অনিয়মের জন্য কারও বিরুদ্ধে পৃথক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।






