মূল দলিল ধ্বংস নয়, ডাকযোগে নাগরিকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হোক

জমির মূল দলিল ধ্বংস নয়, নিরাপদ সংরক্ষণের দাবি
সম্পাদকীয়: এম বি আলম:
জমি মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি। আর সেই সম্পদের মালিকানা, হস্তান্তর, দান, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। একটি জমির দলিল শুধু কয়েক পাতার কাগজ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি সম্পত্তি এবং অনেক সময় একাধিক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
তাই জমি নিবন্ধনের পর মূল দলিল কীভাবে সংরক্ষিত হবে, কখন নাগরিকের হাতে পৌঁছাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ প্রশ্নটি এখন নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
বাংলাদেশে নিবন্ধন ব্যবস্থার মূল আইন Registration Act, 1908। আইনটির ধারা ৮৫-এ বলা হয়েছে, উইল ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে দুই বছরের বেশি সময় দাবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকলে তা ধ্বংস করা যেতে পারে। অর্থাৎ বিধানটি বিশেষভাবে ‘unclaimed’ দলিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিন্তু এক শতাব্দীর বেশি আগে প্রণীত আইন ও বর্তমান ডিজিটাল যুগের বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। বর্তমানে নাগরিকের পরিচয় যাচাই, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, ডিজিটাল রেকর্ড, অনলাইন ট্র্যাকিং এবং ডাক ও কুরিয়ারভিত্তিক নিরাপদ বিতরণব্যবস্থা—সবই বিদ্যমান। ফলে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর কোনো মূল দলিল যদি দীর্ঘদিন অফিসে পড়ে থাকে, তাহলে সেটিকে ‘দাবিহীন’ রেখে দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃত গ্রহীতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা কেন থাকবে না—এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে।
রাজস্ব আদায় যখন হয়, সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি
জমি নিবন্ধনের সময় নাগরিকের কাছ থেকে সরকার বিভিন্ন ধরনের ফি, কর, সার্ভিস চার্জ ও শুল্ক আদায় করে। ২০২৬ সালের Registration (Amendment) Act-এও নিবন্ধনসংক্রান্ত ফি, কর, সার্ভিস চার্জ ও শুল্ক আদায়ের বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্র যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা প্রদানের বিনিময়ে নাগরিকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে, তখন সেই সেবার শেষ ধাপটিও নিরাপদ, সহজ ও নাগরিকবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।
শুধু দলিল নিবন্ধন করেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। দলিলটি নিরাপদে সংরক্ষণ, যথাসময়ে প্রকৃত গ্রহীতার হাতে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তার নির্ভরযোগ্য কপি বা রেকর্ড পাওয়ার নিশ্চয়তাও একটি আধুনিক নিবন্ধন ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত।
দাবিহীন’ দলিলের ক্ষেত্রে নতুন চিন্তা প্রয়োজন
বাস্তবে কোনো নাগরিক নানা কারণে রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল সংগ্রহ করতে বিলম্ব করতে পারেন। ঠিকানা পরিবর্তন, অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান, যোগাযোগের সমস্যা, পারিবারিক জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক কারণে দলিল সংগ্রহে বিলম্ব হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে দুই বছর পার হওয়ার পর দলিল ধ্বংসের সুযোগ থাকা নাগরিকের সম্পত্তির গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তার দাবি রাখে।
তাই সরাসরি ধ্বংসের পরিবর্তে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দলিল গ্রহীতাকে একাধিক মাধ্যমে অবহিত করা যেতে পারে। মোবাইল বার্তা, ডাকযোগে নোটিশ, ই-মেইল এবং ডিজিটাল নিবন্ধন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সতর্ক করা যেতে পারে। এরপরও দলিল গ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব না হলে নিরাপদ সরকারি সংরক্ষণাগারে তা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ডাকযোগে মূল দলিল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকলের মাধ্যমে মূল দলিল গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
রেজিস্ট্রির সময় গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও বর্তমান ঠিকানা যাচাই করে তা ডিজিটাল রেকর্ডে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। দলিল প্রস্তুত ও নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর একটি ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর দিয়ে নিরাপদ প্যাকেটে দলিল পাঠানো যেতে পারে।
প্রয়োজনে—
নিবন্ধিত ডাক;
ট্র্যাকিং সুবিধা;
প্রাপকের জাতীয় পরিচয় যাচাই;
প্রাপ্তির স্বাক্ষর বা ডিজিটাল নিশ্চিতকরণ;
অনলাইন ডেলিভারি স্ট্যাটাস;
ফেরত এলে পুনরায় যোগাযোগের ব্যবস্থা
চালু করা যেতে পারে।
এতে নাগরিককে শুধু একটি মূল দলিল নেওয়ার জন্য বারবার রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমতে পারে।
মূল দলিলের পাশাপাশি ডিজিটাল সংরক্ষণ
আধুনিক ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় শুধু কাগজের দলিল নয়, এর নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ডও সংরক্ষণ করা জরুরি।
Registration Act-এ ইতোমধ্যে নিবন্ধিত নথির রেকর্ড ও কপি সংরক্ষণের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। আইনটিতে রেজিস্ট্রি বই, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নথির কপি সংরক্ষণের বিধানও রয়েছে।
তাই ভবিষ্যতের ব্যবস্থা হওয়া উচিত ‘মূল দলিল + নিরাপদ ডিজিটাল কপি + দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সংরক্ষণ’—এই তিন স্তরের নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে।
কোনো কারণে মূল দলিল হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিক যেন নির্ভরযোগ্য সরকারি ডিজিটাল রেকর্ড থেকে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারেন—সেই ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শুধু আইন নয়, নাগরিকসেবার দর্শনও বদলাতে হবে
আজকের নাগরিক আর পুরোনো আমলের মতো সরকারি অফিসের দরজায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করে সেবা নিতে চান না। প্রযুক্তি যখন ব্যাংকিং, পাসপোর্ট, কর প্রদান, জন্মনিবন্ধনসহ বহু সরকারি ও বেসরকারি সেবাকে নাগরিকের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে, তখন ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নাগরিকবান্ধব চিন্তা প্রয়োজন।
একটি জমির দলিল নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে যদি সরকার নিরাপদ ডাকব্যবস্থা, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এতে নাগরিকের সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হবে।
একই সঙ্গে কমবে অফিসকেন্দ্রিক হয়রানি, মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ এবং দলিল হারানো বা অনিরাপদে পড়ে থাকার ঝুঁকি।
এখন সরকারের করণীয়
জনগণের পক্ষ থেকে তাই কয়েকটি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি—
প্রথমত, Registration Act, 1908-এর সংশ্লিষ্ট বিধান বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
দ্বিতীয়ত, ‘দাবিহীন’ দলিল ধ্বংসের আগে প্রকৃত দলিল গ্রহীতাকে একাধিক মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত করার ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, মূল দলিল দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য আধুনিক, অগ্নিনিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা।
চতুর্থত, রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে মূল দলিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে গ্রাহকের নিবন্ধিত ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করা।
পঞ্চমত, প্রতিটি দলিলের জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং নম্বর চালু করে নাগরিককে অনলাইনে দলিলের অবস্থান জানার সুযোগ দেওয়া।
ষষ্ঠত, মূল দলিলের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার ব্যবস্থা আরও সহজ করা।
সপ্তমত, দলিল বিতরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ নিশ্চিত করা।
এটি কোনো বিলাসী দাবি নয়
জমির দলিল একজন নাগরিকের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ-নথি। তাই এর নিরাপদ সংরক্ষণ ও নাগরিকের হাতে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি আধুনিক জনসেবার স্বাভাবিক অংশ হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের কাছে জনগণের দাবি খুব স্পষ্ট—দলিল ধ্বংসের সুযোগের পরিবর্তে প্রথম অগ্রাধিকার হোক দলিল সংরক্ষণ ও প্রকৃত মালিকের হাতে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া।
সরকার চাইলে নিবন্ধন অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এবং জাতীয় আর্কাইভের সমন্বয়ে একটি আধুনিক ‘মূল দলিল সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ—এই রূপান্তরের বাস্তব অর্থ তখনই প্রতিফলিত হবে, যখন নাগরিককে শুধু ডিজিটাল রেকর্ড নয়, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তির মূল নথিটিও নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে তার হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
জনগণের দাবি—মূল দলিল ধ্বংস নয়; নিরাপদ সংরক্ষণ, ডিজিটাল সুরক্ষা এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ডাকযোগে নাগরিকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা হোক।
এখনই সময় ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর ও সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব করে তোলার।






