মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলেও আপত্তি নেই ইরানের

ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদি। ছবি: এক্স

তেহরানের চোখে এটি ইরানবিরোধী জোট নয়; ঢাকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে আস্থা, আমন্ত্রণ পেলে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করবে ইরান

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে তেহরানের কোনো উদ্বেগ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদি। তাঁর ভাষ্য, ইরান এই চুক্তিকে তেহরানবিরোধী কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ হিসেবেও দেখছে ইরান।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।

জাহানাবাদি বলেন, মক্কা শান্তি চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখে না তেহরান। বাংলাদেশ এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্তই নিক, তাতে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের সরকারের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তেহরান অবগত বলেও জানান তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদি। ছবি: এক্স

চুক্তিটি ইরানের বিরুদ্ধে নয়

মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক রয়েছে এবং এসব দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে তেহরান স্বাভাবিকভাবেই দেখছে। তাঁর মতে, চুক্তিটিকে ইরানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।

বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে—মক্কা চুক্তি তারই একটি প্রকাশ বলে মনে করে তেহরান। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য নিজেদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর প্রবণতাকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছে।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো বিরোধ নেই এবং রিয়াদের সঙ্গে বর্তমানে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ফলে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে তেহরানের উদ্বেগ নেই বলে স্পষ্ট করেন জাহানাবাদি।

আমন্ত্রণ পেলে ইরানও বিবেচনা করবে

মক্কা চুক্তিতে ইরান নিজে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত জানান, তেহরান এখন পর্যন্ত সদস্য হওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন বা প্রস্তাব দেয়নি। তবে চুক্তির সদস্য দেশগুলো থেকে আমন্ত্রণ বা প্রস্তাব এলে বিষয়টি ইরান বিবেচনা করবে।

রাষ্ট্রদূত আরও জানান, প্রায় এক দশক আগে ইরান নিজেই এ অঞ্চলের জন্য অনুরূপ একটি নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা এবং অঞ্চলটির মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণা।

৭ আগস্ট মক্কায় চুক্তি

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র আরও জোরদার করার কাঠামো তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিন দেশ চুক্তির বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের জন্য কাঠামোগত উদ্যোগও এগিয়ে নিচ্ছে।

চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ফলে এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সমন্বয় আরও গভীর করার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একটি নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে।

বাংলাদেশের অবস্থান কী

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় আলোচনা চলছে এবং সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে সৌদি আরব ও তুরস্ক বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য তাই কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মক্কা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, আর তুরস্কের সঙ্গেও তেহরানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে তেহরান কীভাবে দেখছে, তা আঞ্চলিক কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ।

ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চায় তেহরান

সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, তেহরান বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী।

অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা দ্রুত অবসানের পাশাপাশি এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য মক্কা চুক্তিতে যোগদানের বিষয়ে ইরানের প্রকাশ্য অবস্থান আপাতত নিরপেক্ষ ও অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্বেগমুক্ত। তেহরান এটিকে ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে দেখছে না। ফলে ঢাকার সামনে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় সম্ভাব্য অংশগ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে জাতীয় স্বার্থ, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক একই সঙ্গে অক্ষুণ্ন রাখা যায়।