বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

৪৮ বছরে পা দিয়ে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্ন—রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখে কতটা শক্তিশালী হবে বিএনপি
টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথম সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এবার দলের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে ভবিষ্যৎ পথচলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংকট অতিক্রম করে দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় চার দশক তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্ব তাঁর হাতেই ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হলে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ আন্দোলন, মামলা, কারাবাস ও নানা প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। ২০১৮ সালে মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগের পাশাপাশি নতুন বাস্তবতার উপলব্ধিও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন দলটির রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক ঐক্য ও নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি দলের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখার দায়িত্ব এখন তাঁর ওপর।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, খালেদা জিয়া যে গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছেন, সেই পথেই বিএনপির চলা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যত দিন থাকবে, তত দিন খালেদা জিয়ার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও নতুন করে পথচলার উপলক্ষ। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে ভিত্তি করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি কতটা কার্যকরভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দলেও থেকেছে। নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে দলটি। এবার সেই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান নেত্রী নেই। রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।





