সংসদের সামনে শিক্ষিকা হত্যা: বাইকের রঙে অমিল, গ্রেপ্তার নিয়েও প্রশ্ন

সিসিটিভিতে নীল মোটরসাইকেল, র‌্যাবের জব্দ করা বাইক সাদাকালো; সন্দেহভাজন পনির দাবি, তিনি নির্দোষ

টুইট ডেস্ক: জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে স্কুলশিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৬) নিহতের ঘটনায় মূল সন্দেহভাজনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে দাবি করে একটি ইয়ামাহা আর-১৫ মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের রঙের সঙ্গে জব্দ করা বাইকের রঙে অমিল থাকায় তদন্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন মোশাররফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী এবং তার সহযোগী সেড্রিক। র‌্যাবের দাবি, তাদের কাছ থেকে সাদাকালো রঙের একটি ইয়ামাহা আর-১৫ মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‌্যাব-২ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান।

র‌্যাব জানায়, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে পনি ও সেড্রিককে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করে সংস্থাটি।

তবে গ্রেপ্তারের পরই ঘটনার সঙ্গে পনির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি নিজেই। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হলে পনি চিৎকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তার বক্তব্য, তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে। ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নীল রঙের হলেও তার বাইক সাদাকালো।

শনিবার ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজেও জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে নীল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অন্যদিকে র‌্যাবের সরবরাহ করা ছবিতে জব্দ মোটরসাইকেলটি সাদাকালো রঙের। ফলে দুটি মোটরসাইকেল একই কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দ মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব। তিনি র‌্যাবকে জানিয়েছেন, পনি গাজী বিভিন্ন সময় জোর করে তার কাছ থেকে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যেতেন। গত ২৬ আগস্ট থেকে ঘটনার দিন শনিবার বিকেল পর্যন্ত বাইকটি পনির কাছে ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। রাকিবকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

পনিকে গ্রেপ্তারের পক্ষে তিনটি কারণ তুলে ধরেছেন র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক। প্রথমত, মোটরসাইকেলের মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় বাইকটি পনির কাছে ছিল। দ্বিতীয়ত, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলচালকের দৈহিক গঠনের সঙ্গে পনির মিল রয়েছে বলে দাবি করেছে র‌্যাব। স্থানীয় ১৫ জন সোর্সকেও ভিডিও দেখিয়ে পনির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

তৃতীয়ত, ঘটনার সময় রাত আড়াইটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত পনি ও সেড্রিকের ব্যবহৃত মুঠোফোনের অবস্থান ঘটনাস্থলের আশপাশে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব আরও জানায়, পনি গাজীর বিরুদ্ধে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মাদক, চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সিঁধেল চুরি ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে মামলা রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।

তবে র‌্যাবের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে, পনি ও সেড্রিককে এখনো সন্দেহভাজন হিসেবেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় আসামিরা অজ্ঞাত থাকায় প্রাথমিক সন্দেহ ও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয়েছে। আরও তদন্তের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।

মোটরসাইকেলের রঙ নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে নয়মুল হাসান বলেন, আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। দুই সন্দেহভাজনকে থানায় হস্তান্তরের পর আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এদিকে নিহত শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের স্বামী আবদুল মতিন জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাই মোটরসাইকেলটির রং বা ধরন খেয়াল করার সুযোগ হয়নি। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

ফলে রনজিনা পারভীন হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুজনের সম্পৃক্ততা, সিসিটিভিতে দেখা মোটরসাইকেল এবং র‌্যাবের জব্দ করা মোটরসাইকেল একই কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।