মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের কী কী লাভ হবে?

টুইট ডেস্ক: সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে বাংলাদেশ। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ঢাকাকে এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ।

গত ৭ আগস্ট চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের এতে যোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হলে তাতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে কী শর্তে বাংলাদেশ এতে যুক্ত হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কোনো সামরিক জোটে না জড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। ফলে নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি দুটিই বিবেচনা করতে হবে।

চুক্তিতে যোগ দিলে কী লাভ হতে পারে

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, পাকিস্তানের সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সৌদি আরবের আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হলে অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত এবং তারা দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান।

যেসব ঝুঁকি রয়েছে

তবে চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের জন্য কিছু কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কোনো সদস্য দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশকেও পরোক্ষভাবে সেই সংঘাতে যুক্ত হওয়ার চাপ আসতে পারে।

বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধে বাংলাদেশকে কোনো একটি পক্ষের অবস্থান নিতে হতে পারে। এতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়াকে বলেছেন, প্রস্তাবটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো সামরিক জোটে না জড়ানোর বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং মিত্র দেশগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।

ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়

বর্তমানে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ন্যাটোর মতো একীভূত সামরিক জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে না। চুক্তির সদস্যরা এখনো কোনো স্থায়ী সদরদপ্তর বা ন্যাটোর আদলে একীভূত সামরিক কমান্ড প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়নি।

এ ছাড়া সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে কিংবা কোনো সদস্য দেশ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অন্য সদস্যরা ঠিক কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

ভারতের উদ্বেগ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ভারতও উদ্বিগ্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ পাকিস্তান এ চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের কাছ থেকে আরও সামরিক সহযোগিতা এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে আর্থিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের জন্য বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করবে। কারণ চুক্তির রাজনৈতিক প্রভাব ভারতের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাঁর ধারণা, ভারত বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও মনে করেন, বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। তাঁর মতে, ভারত এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখবে না এবং বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে নিজেদের নিরাপত্তা-সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া হিসেবে দেখতে পারে।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর সঙ্গে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকিও রয়েছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।