ভূমিকম্পের ৩ মিনিট পর নেপালে মহাদুর্যোগ, নিহত ১৫৭

হিমবাহের বরফ-পাথর ধসে মুহূর্তে নেমে আসে পানির ঢল, নিখোঁজ শত শত; বিপর্যস্ত নেপাল-তিব্বত সীমান্ত

টুইট ডেস্ক: নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহতম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটির সাক্ষী হলো দেশটি। বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন চার শতাধিক মানুষ, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী।

নেপালের বাগমতী প্রদেশের রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোর্খা, তানাহুঁ ও নওয়ালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ এই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। নদীর তীব্র স্রোত ও কাদার ঢলে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভেসে যায়। অনেক এলাকায় কাদার নিচে চাপা পড়ে যায় বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।

নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই মানস সরোবরসহ হিমালয় অঞ্চলের তীর্থ ও পর্যটন গন্তব্যে যাওয়ার পথে ছিলেন।

দুর্যোগের শুরু নিয়ে প্রথমদিকে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার সময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলা হয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্প হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে ভূমিকম্পই বন্যার সরাসরি কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের বিষয়টি সামনে এসেছে। বরফ-পাথরের ধসে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পরে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে ভয়াবহ পানির ঢল নামে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কোনো বড় ধরনের সতর্কবার্তা পাওয়ার আগেই কাদামাটি, পানি ও পাথরের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকায় নেমে আসে। নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। কোথাও আবার কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে।

দুর্যোগের কারণে নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

উদ্ধার তৎপরতায় নেপাল সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হলেও অতিরিক্ত পানির প্রবাহ, কাদামাটি এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। নেপাল সীমান্তবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্রেও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, বরফ গলার প্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা ও দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ যত এগোবে, ততই এই ভয়াবহ দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে।