বান্দরবানে বন্যায় ৭০ কোটির বেশি ক্ষতি, কৃষিতে বিপর্যয়

সাড়ে ৫ হাজার কৃষকের স্বপ্ন ভেসে গেল পাহাড়ি ঢলে
টুইট ডেস্ক: কয়েকদিন আগেও পাহাড়ের বুকজুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ। লাউ, শসা, মরিচ, বেগুন, বরবটি আর টমেটোতে ভরা ক্ষেতগুলো ছিল কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু টানা ৯ দিনের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের বন্যায় সেই স্বপ্ন এখন কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।
বান্দরবানের বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত আজ নীরব এক শোকগাথা। যেদিকে চোখ যায় শুধু খা খা মাঠ আর বন্যার রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবারের বন্যায় জেলার ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৫ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষক। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি টাকারও বেশি।
ভেসে গেল স্বপ্ন, রয়ে গেল ঋণ
রেইছা সদর ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার *কনক তংচঙ্গ্যা* ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কলা বাগান, বেগুন, ধনেপাতা, শিম ও মাছের ঘের করেছিলেন।
বুক ভরা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, _পানি সব ধ্বস করে দিয়ে গেছে। পুকুরের সব মাছ ভেসে গেছে। এখন কি খাবো? ব্যাংক লোন কিভাবে পরিশোধ করব? পরিবার নিয়ে কিভাবে কাটব বুঝতে পারছি না।”_
তালুকদার পাড়ার *মংশৈনু মারমা*-র শসা, বরবটি, কাকরোল সব শেষ। _“লোন নিয়ে চাষ করেছিলাম। সব ধ্বস। সরকার সহযোগিতা করবে কিনা জানি না”- হতাশা তার কণ্ঠে।
ভরাখালীর করিম বলেন, _“ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ঢেরশ, বেগুন চাষ করেছিলাম। সব পানিতে ভেসে গেছে।”
গোয়ালিয়াখোলা, দুংখি পাড়া, রত্নপুর, তারাছা, ভরাখালী, লেমুঝিড়ি – একসময় যেগুলোকে বলা হতো “সবজির কারখানা”, আজ সেখানে শুধু পঁচা বেগুন, নষ্ট ধনেপাতা আর ভেঙে পড়া কলা গাছ।
সদরেই ক্ষতি ১০ কোটির বেশি:-
শুধু সদর উপজেলাতেই ১০ কোটি ৮১ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকার* ফসল নষ্ট। ২ হাজার ৮৫০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত।
নষ্ট হয়েছে ১৯.৯০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৪৫.৫ হেক্টর আউশ বীজতলা, ২১৭.৩০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ও ১৫.৮০ হেক্টর ফল বাগান।
আলীকদমে ৭৯ জন চাষির ৫২ লক্ষ টাকার* ক্ষতি।
মৎস্য খাতেও ধ্বস:-
বন্যায় পুকুর ডুবে গেছে হাজারো মাছ। *বিধু মল্লিক*-এর ৬ লাখ, *আমেনা বেগম*-এর ৭ লাখ টাকার ক্ষতি।
আলীকদম উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা *মো. আসাদুজ্জামান* জানান, ৭৯ জন মৎস্যচাষির প্রায় ৫২ লাখ টাকার* ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগ: প্রণোদনা দেওয়া হবে*
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন* বলেন, _“আমন বীজতলা, আউশ, সবজি, ফলবাগান সব পানিতে নিমজ্জিত। মাঠ পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চলছে। তালিকা শেষে প্রণোদনা দেওয়া হবে।”_
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাকিবুল হাসান* জানান, দ্রুত তালিকা করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। কৃষি বিভাগ কৃষকের পাশে আছে।
বাজারেও আগুন
ফসল নষ্ট হওয়ায় বাজারে সবজির দাম কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা ছাড়িয়ে হাত দিলে ১০০/ টাকা । কৃষকরাও কিনতে পারছে না, ক্রেতারাও না।
বান্দরবানের কৃষক আজ নিঃস্ব। একদিকে ব্যাংক-এনজিওর ঋণ, অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা।
আপনারা যারা শহরে আছেন, যারা সরকারের সাথে আছেন, যারা মানবিক – আসুন আমরা এই কৃষকদের পাশে দাঁড়াই।
সহায়তা করুন – এলাকায় ত্রাণ, বীজ, সার নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনকে সহযোগিতা করুন।
কণ্ঠ তুলুন- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ ও বীজ সহায়তার দাবি জানান।
কনক তংচঙ্গ্যা, মংশৈনু মারমা, বিধু মল্লিকদের মতো হাজারো কৃষক আজ উত্তর চায় – _“আমরা কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবো?”_
আসুন, আমরা বলি – *হ্যাঁ, পারবে। কারণ বান্দরবান একা না। আমরা সবাই আছি।*
বান্দরবান বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। কৃষক বাঁচলে, টেবিলে ভাত আসবে।






