বান্দরবানে পাহাড়ধসের তীব্র শঙ্কা, ৩ উপজেলায় উচ্চ সতর্কতা: লামায় ধসে নিহত ৫

পার্বত্য অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে বাড়ছে প্রাণহানি, নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা জারি।

নিজস্ব প্রতিনিধি, বান্দরবান: টানা ভারি বর্ষণে বান্দরবানসহ দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ধসের তীব্র শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী তিন দিনে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে জেলার তিনটি উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বুধবার রাতে এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, লঘুচাপ ও প্রবল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বান্দরবানসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই অতি ভারি বর্ষণ পাহাড়ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (০৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) বান্দরবান জেলায় ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে পাহাড়ি এলাকার মাটি নরম হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বান্দরবান সদর, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাকে পাহাড়ধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল ও বসতিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছে।

এরই মধ্যে লামা উপজেলায় ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় পৃথক দুটি ধসে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন হলেন—মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মো. সোলেমান। অপর ঘটনায় একই এলাকার আরেকটি পাহাড়ধসে এক দম্পতি নিহত হয়েছেন, তবে তাদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

জেলার পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান, ভোররাতে ঘুমন্ত অবস্থায় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ধস নামলে ঘুমন্ত মানুষগুলো বের হওয়ার সুযোগ পাননি।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময়ের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়লে ধসের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার বিকল্প নেই।

এদিকে, টানা বর্ষণে জেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় পাহাড়ধস ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অন্তত ২২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকায় পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো কাটেনি। ফলে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।