ইসলামিক বোমার ছায়া: ইরান,পাকিস্তান গোপন সংযোগের নতুন বিশ্লেষণ

পারমাণবিক প্রযুক্তি বিস্তারে এ কিউ খানের নেটওয়ার্ক নিয়ে ফের আলোচনায় ভূরাজনীতি।

 

টুইট ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তথাকথিত ‘ইসলামিক বোমা’ ইরানকে পরমাণু শক্তিধর করার পেছনে পাকিস্তানের গোপন সহায়তার অভিযোগ নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি তুলছে।

সাম্প্রতিক সময়ের আঞ্চলিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থান এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।

পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির প্রধান স্থপতি আব্দুল কাদির খান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।

তার গড়ে তোলা গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান, উত্তর কোরিয়া ও লিবিয়ায় পারমাণবিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহুবার এই নেটওয়ার্ককে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ভুট্টোর ‘অস্তিত্বের লড়াই’ থেকে পরমাণু কর্মসূচি
১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো দেশকে পরমাণু শক্তিধর করার সিদ্ধান্ত নেন।

তার ভাষায়, এটি ছিল “জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার চাবিকাঠি”। সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন কাদির খান, যিনি ইউরোপে কাজ করার সময় গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে সফলভাবে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে বিশ্বের সপ্তম পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এই সাফল্যের পেছনে কাদির খানের অবদান যেমন স্বীকৃত, তেমনি তার আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কও ততটাই গভীর।

ইরান সংযোগ: গোপন সহযোগিতার অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, কাদির খানের নেটওয়ার্কের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ।

ইসলামি বিপ্লবের পর পশ্চিমা সমর্থন হারানো ইরান ১৯৮০ এর দশকে বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে। সে সময় পাকিস্তানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ স্থাপনের অভিযোগ উঠে।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি পরবর্তীতে স্বীকার করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকির মোকাবিলায় বিকল্প সক্ষমতা অর্জনের চিন্তা ছিল তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।

যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছিলেন, বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতি নীতিগত অবস্থানকে আংশিকভাবে পরিবর্তনে বাধ্য করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

বৈশ্বিক শক্তির দ্বিমুখী নীতি?
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির প্রতি নীরব সমর্থন বা উপেক্ষা দেখায়।

বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর ইসলামাবাদকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে এই ইস্যুতে নমনীয়তা দেখা যায়।

অন্যদিকে, ইসরাইলের নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা এবং ইরানকে ঘিরে কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বিতর্ককে জোরদার করেছে।

নতুন বাস্তবতায় পুরোনো নেটওয়ার্কের ছায়া
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পশ্চিমা চাপ,সব মিলিয়ে কাদির খানের গড়ে তোলা নেটওয়ার্কের ঐতিহাসিক ভূমিকা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের এই গোপন সহযোগিতার জাল এখনো বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

ফলে ‘ইসলামিক বোমা’ ধারণাটি শুধু ইতিহাস নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে