রুমায় সড়কহীন পাঁচ পাড়া

চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকায় চরম বঞ্চনা; প্রসবে শিশুমৃত্যু, পচছে জুমের ফসল!

বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবানের রুমা উপজেলা-এর দুর্গম পাহাড়ি পাঁচটি গ্রাম আজও সড়কবিহীন। দেড়শোর বেশি পরিবার প্রতিদিন লড়ছে যোগাযোগহীনতার নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে। নদী পেরিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার দুর্গম পাহাড়ি পথই একমাত্র ভরসা।

যেখানে নেই কোনো যানবাহন, নেই পাকা রাস্তা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম বঞ্চনার শিকার স্থানীয় বাসিন্দারা।

পাঁচ পাড়া, এক দুর্ভোগ

পাইন্দু ইউনিয়ন-এর আলেচুপাড়া, তংমকপাড়া, কান্নাপাড়া, বাগানপাড়া ও থোয়াইবতং পাড়া—এই পাঁচটি গ্রামে মারমা ও বম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার সড়কপথ পেরিয়ে রুমা উপজেলায় পৌঁছাতে হয়। এরপর কক্ষংঝিরি বাজার থেকে সাঙ্গু নদী পার হয়ে কাঁচা পাহাড়ি পথে দীর্ঘ হাঁটাই একমাত্র উপায়।

সপ্তাহে একদিন বুধবারের হাটবারে গ্রামবাসীরা মূল সড়কে আসেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ এই কষ্টকর পথ পাড়ি দিতে চান না।

স্বাস্থ্যসেবায় মৃত্যুফাঁদ

যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব সবচেয়ে ভয়াবহভাবে আঘাত করেছে স্বাস্থ্য খাতে। গত ২২ জানুয়ারি আলেচুপাড়ার বাসিন্দা সিংনু মারমা প্রসব বেদনায় আক্রান্ত হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রামের সীমিত চিকিৎসা সহায়তায় প্রসবের চেষ্টা করতে গিয়ে যমজ সন্তানের একজন মারা যায়।

পরবর্তীতে মায়ের অবস্থা গুরুতর হলে তাঁকে কম্বলে মোড়ানো স্ট্রেচারে করে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে প্রথমে বান্দরবান সদর হাসপাতাল, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ পাঠানো হয়।

পরিবারের ভাষ্য সড়ক থাকলে হয়তো শিশুটিকে বাঁচানো যেত।

জীবিকায় ধস, পচছে ফসল

এই পাঁচ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সড়ক না থাকায় উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারেন না ঠিকমতো। ফলে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়, নয়তো ফসল পচে নষ্ট হয়ে যায়।

স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, কাঁধে করে বস্তা বহন করে পাহাড়ি পথে বাজারে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অনেক সময় বাজারে নেওয়ার আগেই ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও ওঠে না।

শিক্ষায় অন্ধকার

আলেচুপাড়ায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেটি একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি, দারিদ্র্য ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিশুদের বড় অংশই ঝরে পড়ছে।

স্থানীয় তরুণদের অভিযোগ শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সব ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে পড়ছে শুধু একটি সড়কের অভাবে।

প্রতিশ্রুতি আছে, কাজ নেই

স্থানীয়দের দাবি, কক্ষংঝিরি বাজার থেকে আলেচুপাড়া পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ হলেই বদলে যেতে পারে পাঁচ গ্রামের চিত্র। ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে একাধিকবার উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেশের একটি অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন চিত্র শুধু অবকাঠামোগত ঘাটতির নয়, বরং উন্নয়ন বৈষম্যেরও স্পষ্ট প্রতিফলন। যেখানে একটি সড়ক মানেই হতে পারে জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো, সেখানে দীর্ঘদিনের অবহেলা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।

সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের বিচ্ছিন্ন জনপদের জন্য দ্রুত, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।