বৈসাবির আগমনী সুরে পাহাড়জুড়ে তাঁতের টুংটাং

বৈসাবি ঘিরে তাঁতপাড়ায় ব্যস্ততা। ঐতিহ্যবাহী পিনন-হাদি ও রিনাই-রিসা বুননে দিন-রাত শ্রম দিচ্ছেন পাহাড়ি নারীরা।
বান্দরবান থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি: দারগোড়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এ উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
উৎসবকে সামনে রেখে পার্বত্য অঞ্চলের পাড়ায় পাড়ায় বেড়েছে তাঁতীদের কর্মব্যস্ততা।
বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরিতে এখন সময় পার করছেন পাহাড়ি নারীরা। কেউ নিজের বা পরিবারের জন্য, আবার কেউ বিক্রির উদ্দেশ্যে কোমর তাঁতে কাপড় বুনছেন।
তাঁতশিল্পীরা জানান, একসময় সীমিত রঙের সুতা দিয়ে পিনন-হাদি তৈরি হলেও এখন ব্যবহৃত হচ্ছে নানা রঙের সুতা। পাশাপাশি নিজের পছন্দমতো নতুন নতুন নকশাও যুক্ত করছেন তাঁতিরা, যা পোশাকে এনেছে বৈচিত্র্য।
পার্বত্য তিন জেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দেখা যায়, একেকজন তাঁতি একটি তাঁতে দুই থেকে তিনটি রিনাই বুনছেন। কনিকা ত্রিপুরা, অনিমা চাকমা, সুচরিতা তঞ্চঙ্গ্যা ও মনিকা বম জানান, নিজেদের নকশায় দুই সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি পোশাক তৈরি করছেন তারা। উৎসবের আগেই কাজ শেষ করতে রাত-দিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুজা চাকমা জানান, ফেব্রুয়ারি থেকেই তিনি পিনন-হাদি বুনছেন। এসব পোশাক বিক্রি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতে পারছেন।
অন্যদিকে নীলাচল এলাকার ভাইবোনছড়ার রেনুকা চাকমা বলেন, সারা বছর কোমর তাঁতে কাপড় বুনলেও ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। তবে বৈসাবি উপলক্ষে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ সময় ভালো দাম পাওয়া যায়। অনেকেই আগে থেকেই পছন্দের নকশা দিয়ে অর্ডার দেন, সেই অনুযায়ী পোশাক তৈরি করা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী পৃথকভাবে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু ও চাংক্রান নামে এ উৎসব পালন করে। সমতলের মানুষের কাছে এটি ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত, যা ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু, এই তিন নামের আদ্যক্ষর থেকে এসেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে কোমর তাঁতে পোশাক বোনার এই প্রক্রিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। কাঠ ও বাঁশের বিশেষ কাঠামো কোমরে বেঁধে কাপড় বোনার এ পদ্ধতি এখনো টিকে আছে পাহাড়ি নারীদের হাতে। চাকমাদের কাছে এটি পিনন-হাদি এবং ত্রিপুরাদের কাছে রিনাই-রিসা নামে পরিচিত।
বৈসাবি হলো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর প্রধান বর্ষবরণ উৎসব।
এই নামটি তিনটি আলাদা উৎসবের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত:
বৈ — ত্রিপুরাদের বৈসু (বা বাইসু) উৎসব থেকে,
সা — মারমাদের সাংগ্রাই উৎসব থেকে,
বি — চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু (বা বিঝু) উৎসব থেকে।
এভাবে বৈ-সা-বি মিলে হয়েছে বৈসাবি।
কখন হয়
সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন (অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ) এই তিন দিনব্যাপী উৎসব পালিত হয়।
উৎসবের মূল আনন্দ
পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট ও পাপ ধুয়ে ফেলার জন্য নদীতে ফুল ভাসানো (ফুল বিজু)। ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান, রঙিন পোশাক পরা। মারমাদের বিখ্যাত জল উৎসব (পানি ছিটিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়)। বিভিন্ন ধরনের পিঠা, ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি ও অতিথি আপ্যায়ন। গ্রামে গ্রামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসব।
এটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐক্যের প্রতীক। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও নতুন বছরের আশা-আনন্দকে তুলে ধরে। বর্তমানে অনেক বাঙালিও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকেন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বৈসাবি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যৌথ নববর্ষ উদযাপনের একটি রঙিন ও প্রাণবন্ত উৎসব।
সারা বছর অন্য পোশাক পরলেও বর্ষবরণ ও বিদায়ের উৎসবে পাহাড়ি নারীদের প্রথম পছন্দ থাকে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক। তাই বৈসাবি ঘিরে এখন পাহাড়জুড়ে চলছে রঙিন সুতা আর স্বপ্ন বোনার ব্যস্ততা






