হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে, বিশ্ব তেল বাজারে তীব্র সংকট

হরমুজ প্রণালী ‘জিম্মি’ ইরানের। বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রধান ধমনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুদ্ধে কৌশলগত পাল্টা শক্তি তৈরি তেহরানের।

বিশ্ব ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান বহুদিনের পরিকল্পিত একটি কৌশল বাস্তবায়ন করেছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালীকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

আঞ্চলিক তিনটি সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে তেহরান দীর্ঘদিন ধরে এই কৌশল তৈরি করেছিল।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। ইরানের উত্তর উপকূল ঘেঁষা এই সরু নৌপথে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই পথকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র জানায়, প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। ইরানি নৌবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বাহিনী মাইন স্থাপন, জাহাজে সতর্ক হামলা এবং নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার মাধ্যমে কার্যত প্রণালীটির কার্যক্রম স্থবির করে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৭টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, এখন সেই সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে বলে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় অনেক বিশ্লেষক ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর ঝুঁকির কথা উল্লেখ করছেন।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের অবকাঠামোর ওপর আরও হামলার হুমকিও দিয়েছেন।

তেহরানের পক্ষ থেকে পাল্টা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-সমর্থিত তেল স্থাপনা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রণালী খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই প্রণালী বন্ধ রাখার অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও ইরান জ্বালানি বাজারকে কেন্দ্র করে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করছে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইতিমধ্যে সদস্য দেশগুলোকে কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা, বিবিসি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র।