বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে রমজান মাস

তাকওয়া, আত্মসংযম ও মানবিকতার শিক্ষা সারা বছর জীবনে ধারণের আহ্বান
টুইট ডেস্ক: পবিত্র রমজান মাস প্রায় শেষপ্রান্তে। এক বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে মাসটি মুসলমানদের জীবনে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে, সেই মহিমান্বিত সময় এখন বিদায়ের প্রহর গুনছে। কিছুদিন আগেও সাহরির নীরবতা, ইফতারের ব্যস্ততা, মসজিদে তারাবির সুমধুর তিলাওয়াত এবং ইবাদতের আবহে মুখর ছিল সমাজ। কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে রমজান এখন শেষ দশক পেরিয়ে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া মানে কেবল আল্লাহভীতি নয়; বরং প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি ধারণ করা। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে রোজাদাররা প্রমাণ করেন,আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। নির্জনে থেকেও পানাহার থেকে বিরত থাকা আসলে আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যেরই প্রকাশ।
রমজান মানুষকে আত্মসংযম ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। এই মাসে শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকাই উদ্দেশ্য নয়; বরং নৈতিক চরিত্র গঠনের অনুশীলনও এর অন্যতম দিক। রাগ দমন, অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া,এসব গুণাবলি রোজার মাধ্যমে মানুষের আচরণে শৃঙ্খলা আনে। ফলে রমজান ব্যক্তিগত চরিত্র উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে ওঠে।
এ মাস মুসলমানদের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করারও সময়। কারণ রমজানেই কোরআন নাজিল হয়েছিল। তাই বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা এ মাসে কোরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুধাবনে বেশি মনোযোগী হন।
অনেকেই পুরো কোরআন খতমের চেষ্টা করেন। তবে আলেমরা মনে করিয়ে দেন,কোরআনের শিক্ষা যদি শুধু রমজানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। বরং সারা বছর জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
রমজান মানবিকতা ও সহমর্মিতারও এক অনন্য শিক্ষা দেয়। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করার মাধ্যমে মানুষ দরিদ্র ও অসহায়দের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। ফলে দান-সদকা, জাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজের অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা বাড়ে।
ইফতার বিতরণসহ বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ সমাজে সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করে।
এ ছাড়া সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রেও রমজান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত ধৈর্যের অনুশীলন, তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকির নসব মিলিয়ে সময়কে অর্থবহভাবে কাজে লাগানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই অভ্যাস যদি সারা বছর ধরে বজায় রাখা যায়, তবে ব্যক্তিগত জীবন আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
রমজানের শেষপ্রান্তে এসে মুসলমানদের জন্য আত্মসমালোচনারও একটি সময় তৈরি হয়। এই মাসের ইবাদত, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা যদি জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে, তবেই রমজানের প্রকৃত সফলতা অর্জিত হবে। আলেমরা মনে করিয়ে দেন,আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো নিয়মিত করা আমল, যদিও তা পরিমাণে কম হোক।
অতএব রমজান বিদায় নিলেও এর শিক্ষা যেন মানুষের জীবন থেকে বিদায় না নেয়,এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন ধর্মীয় চিন্তাবিদরা। তাঁদের মতে, তাকওয়া, সহমর্মিতা ও ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলেই রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা ঘটাবে।





