ফেরির ফাঁদে রাঙামাটি–বান্দরবান সড়ক

ছবি: নিজস্ব

কর্ণফুলী পারাপারে সেতুর অভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা; যোগাযোগ, চিকিৎসা ও ব্যবসায় মারাত্মক ভোগান্তি।

অসীম রায় (অশ্বিনী): রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কের চন্দ্রঘোনা–রাইখালী অংশে কর্ণফুলী নদী পারাপারে এখনো ফেরির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন রাঙামাটি, বান্দরবান ও রাজস্থলী অঞ্চলের হাজারো মানুষ।

প্রতিদিন এই ফেরি ঘাট দিয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ যানবাহন পারাপার করে। ফলে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এতে সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন শ্রমিকরা।

একটি সেতুই বদলে দিতে পারে রাঙামাটি–বান্দরবান–রাজস্থলীর যোগাযোগ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন।

স্থানীয়দের মতে, যে পথ সেতু থাকলে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটে অতিক্রম করা সম্ভব, সেখানে এখন সময় লাগছে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

একজন বাসচালক জানান, ফেরির লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় অনেক সময় দুই থেকে তিনটি ট্রিপ কম দিতে হয়। এতে পরিবহন শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীরাও নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা যায় জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সকে দীর্ঘক্ষণ ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠা তখন চরমে পৌঁছে যায়।

রাজস্থলীর এক বাসিন্দা বলেন, রাতে বা ভোরে রোগী নিয়ে বের হলে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেতু থাকলে কয়েক মিনিটেই নদী পার হওয়া সম্ভব হতো।

বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। কাপ্তাই বাঁধ থেকে পানি ছাড়া হলে কর্ণফুলী নদীতে স্রোত বেড়ে যায়। অতিরিক্ত স্রোতের কারণে অনেক সময় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। চলতি বছরও কয়েক দফায় প্রায় ১৫ দিনের মতো ফেরি সেবা বন্ধ ছিল। ফলে রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীদের বিকল্প দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার করতে হয়।

জোয়ারের সময় ফেরির পাটাতনে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। আবার ভাটার সময় ফেরি নিচে নেমে যাওয়ায় যানবাহন ওঠানামায় ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রায়ই গাড়ি বিকল হয়ে ফেরির ওপর আটকে থাকার ঘটনাও ঘটে।

১৯৮৯ সালে রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কে সরাসরি যান চলাচলের সুবিধা দিতে ফেরি সেবা চালু করা হয়েছিল। সে সময় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যানবাহন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে ফেরি ব্যবস্থা এখন বড় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, চন্দ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ও চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি, বান্দরবান ও রাজস্থলী অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়দের দাবি, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা হলো চন্দ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ। তাদের মতে, এই সড়ক শুধু দুটি জেলার সংযোগ নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী।

কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ, ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহন এবং দৈনন্দিন যাতায়াত—সবকিছুই এই পথের ওপর নির্ভরশীল। একটি সেতু নির্মাণ হলে সময় সাশ্রয় হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জরুরি সেবার মান উন্নত হবে।

পার্বত্য জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সেতুর স্বপ্ন দেখে আসছেন। প্রতিদিন ফেরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত যানবাহন যেন সেই অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কর্ণফুলীর বুকে একটি সেতু শুধু অবকাঠামো নয়, এটি হবে মানুষের সময়, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতীক।

এখন প্রশ্ন—কবে বাস্তবে রূপ নেবে সেই স্বপ্ন, আর কবে শেষ হবে ফেরির ফাঁদে আটকে থাকা রাঙামাটি–বান্দরবান সড়কের দীর্ঘ দুর্ভোগ।