রংপুরে তামাকের দখলে উর্বর জমি

তারাগঞ্জে বাড়ছে তামাক চাষ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা; বিকল্প ফসলে লাভের সম্ভাবনা।
আব্দুল্লাহিল শাহীন (রংপুর): রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় দ্রুত বাড়ছে তামাক চাষ। একসময় ধান, আলু, ভুট্টা ও গম উৎপাদনের জন্য পরিচিত উর্বর কৃষিজমির বড় একটি অংশ এখন তামাক আবাদে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অধিক লাভের আশায় কৃষকেরা এই চাষে ঝুঁকলেও এতে জমির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশ দূষণ এবং কৃষক পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর, চাকলা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তামাকের ক্ষেত। কয়েক বছর আগেও এসব জমিতে ধান, আলু ও ভুট্টার চাষ হতো। কিন্তু এখন অধিকাংশ জমিতেই তামাক গাছের পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার ও পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহুজাতিক তামাক উৎপাদনকারী বিভিন্ন কোম্পানি সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তামাক চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। তারা আগাম ঋণ, বীজ, সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ করছে। মৌসুম শেষে নির্ধারিত দামে তামাক পাতা কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় অনেক কৃষক সহজ বাজার ও দ্রুত লাভের আশায় এই চাষে ঝুঁকছেন।
চাকলা গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম, দিলিপ রায়, ভূপেন চন্দ্র ও রবিউল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছরে এলাকায় তামাক চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের ভাষায়, “তামাক কোম্পানি আগাম টাকা ও উপকরণ দেয়। ফলে অনেক কৃষক ঝুঁকি না ভেবেই এই চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।”
তবে সচেতন মহলের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করছে। এছাড়া তামাক পাতা সংগ্রহের সময় কৃষকের শরীরে নিকোটিনসহ ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করতে পারে, যা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আফতারুল হোসেন বলেন, “তামাক পাতা সংগ্রহের সময় কৃষকেরা দীর্ঘ সময় গাছের সংস্পর্শে থাকেন। এতে শরীরে ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আলী হাসান ও জুলফিকার জানান, আগে এই এলাকায় ধান, ভুট্টা ও নানা ধরনের সবজি চাষ হতো। এখন অনেক জমিতেই শুধু তামাক দেখা যায়। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তামাক চাষ মাটির উর্বরতা দ্রুত কমিয়ে দেয়। একই জমিতে কয়েক বছর তামাক চাষ করলে পরবর্তী সময়ে অন্য ফসলের ফলন কমে যেতে পারে।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, “তামাক কোনো উপকারী ফসল নয়। এটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তামাক চাষে জমির উর্বরতা কমে যায় এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই কৃষকদের এই চাষ থেকে নিরুৎসাহিত করতে আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।”
বিকল্প ফসলে লাভের সম্ভাবনা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তারাগঞ্জসহ রংপুর অঞ্চলে তামাকের পরিবর্তে আলু, ভুট্টা, সরিষা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে সমান বা আরও বেশি আয় করা সম্ভব।
উন্নত জাতের আলু চাষে প্রতি বিঘায় ৮০ থেকে ১০০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বাজারমূল্য ভালো থাকলে খরচ বাদ দিয়ে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে। একইভাবে হাইব্রিড ভুট্টা চাষে প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৫০ মণ ফলন পাওয়া যায় এবং তামাকের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি লাভ করা সম্ভব।
সরিষা ও বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষেও কৃষকেরা ভালো আয় করতে পারেন। সঠিক ব্যবস্থাপনায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও বেগুন চাষে প্রতি বিঘায় ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
এছাড়া তারাগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষও শুরু হয়েছে। তামাক চাষ ছেড়ে কয়েকজন কৃষক চা বাগান গড়ে বছরে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করছেন।
স্থানীয় কৃষক শহিদুল ইসলাম ও দিলিপ রায় বলেন, “তামাক চাষে প্রথমে লাভ মনে হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর জমি নষ্ট হয়ে যায়। আলু বা ভুট্টা করলে জমি ভালো থাকে এবং সরকারও সহায়তা দেয়।”
উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, আগামী রবি মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ ও ভর্তুকি দেওয়া হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষ কমিয়ে খাদ্যশস্য ও সবজি চাষ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।






